‘ওরা যেভাবে মারছিল, আমি ভাবছিলাম আর বাঁচব না’
হাসপাতালের মেঝেতে পাতা বিছানায় কাতর হয়ে শুয়ে আছেন মাছ ব্যবসায়ী রাজ্জাক শেখ। পাশে বসে কখনও চোখ মুছছেন স্ত্রী ফাতেমা বেগম, কখনও বিলাপ করছেন বড় বোন শরীফা বেগম। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো ওয়ার্ডের পরিবেশ।
মঙ্গলবার সকালে মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে এমন দৃশ্য দেখা যায়। কথা বলতে গিয়ে ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠেন রাজ্জাক শেখ।
একপর্যায়ে তিনি বলেন, 'ওরা যেভাবে মারছিল, আমি ভাবছিলাম আর বাঁচব না। পরে ৯৯৯-এ ফোন দেওয়ার পর পুলিশ এসে আমাদের উদ্ধার করে। ট্রিপল নাইনে ফোন দিয়েই বাঁচলাম'।
বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার সোনাইলতলা ইউনিয়নের উলুবুনিয়া গ্রামে চাঁদা দাবি, মারধর, টাকা ছিনতাই এবং বাড়িঘরে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় মাছ ব্যবসায়ী রাজ্জাক শেখ, স্থানীয় বিএনপি নেতা জাহিদ শেখ এবং রাজ্জাকের বড় বোন শরীফা বেগমের ওপর দফায় দফায় হামলা চালানো হয়েছে।
এ সময় কয়েক লাখ টাকা, স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেওয়া এবং বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে বলে দাবি তাদের।
আহতরা বর্তমানে মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ঘটনায় মোংলা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত পক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উলুবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা রাজ্জাক শেখ দীর্ঘদিন ধরে সাগরে মাছের ব্যবসা করেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, তার আর্থিক সচ্ছলতার সুযোগ নিয়ে একই এলাকার কামরুল শেখ ও মোশারেফ শেখসহ কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে তার কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিল। বিভিন্ন সময়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। পরিবারের সদস্যরা জানান, সম্প্রতি মাছ বিক্রি করে বাড়ি ফেরার পর আবারও রাজ্জাকের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়। কিন্তু এবার তিনি টাকা দিতে রাজি হননি। এর জেরে গত রোববার সকালে উলুবুনিয়া এলাকার চেয়ারম্যানের মোড়'-এ তার পথরোধ করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, এ সময় রাজ্জাকের সঙ্গে থাকা স্থানীয় ওয়ার্ড বিএনপি নেতা জাহিদ শেখ প্রতিবাদ করলে তাকেও মারধর করা হয়। হামলার সময় জাহিদের কাছে ব্যাংকে জমা দেওয়ার জন্য থাকা প্রায় দেড় লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়।
পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আহতদের উদ্ধার করে মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের হস্তক্ষেপের পরও পরিস্থিতি থামেনি। চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফেরার পরদিন সোমবার সকালে উলুবুনিয়া খেয়াঘাট এলাকায় পুনরায় রাজ্জাক শেখের ওপর হামলা চালানো হয়। এ সময় ব্যবসার কাজে সঙ্গে থাকা আরও প্রায় দুই লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
ভাইকে মারধরের খবর শুনে ছুটে আসেন শরীফা বেগম। পরিবারের দাবি, তাকেও মারধর করা হয় এবং কানের দুল ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে রাজ্জাকের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন স্বজনরা।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি নেতা জাহিদ শেখ বলেন, 'মাছ ব্যবসায়ী রাজ্জাকের কাছে অহেতুক চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল। আমি প্রতিবাদ করায় আমার ওপর হামলা চালানো হয়েছে। আমি প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু বিচার চাই'।
তবে অভিযুক্ত কামরুল শেখ ও মোশারেফ শেখের পক্ষ থেকে অভিযোগগুলো অস্বীকার করা হয়েছে। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তাদের পক্ষের একজন প্রতিনিধি বলেন, 'এটি মূলত স্থানীয় বিরোধের ঘটনা। এখানে চাঁদাবাজি বা লুটপাটের কোনো ঘটনা ঘটেনি। সামান্য হাতাহাতিকে রাজনৈতিকভাবে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে'।
এ বিষয়ে মোংলা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মানিক চন্দ্র গাইন বলেন, 'ঘটনার লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। যেহেতু দুই পক্ষের বক্তব্য ভিন্ন, তাই বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে'।
Comments