প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়তে চায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীন
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দুই দেশই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বন্ধুত্বের পর্যায়ে নিতে চায়। প্রতিযোগিতা থাকলেও তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা চায় না। এই সম্পর্ক কেবল দুই দেশের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
প্রাথমিক কথাবার্তায় তেমনই আভাস দিয়েছেন দুই প্রেসিডেন্ট। নির্ধারিত সময়ের চেয়েও দীর্ঘ বৈঠক হয়েছে ট্রাম্প ও শির মধ্যে। শিকে নিজের বন্ধু বলে সম্বোধন করেছেন ট্রাম্প। তবে শি তার বক্তব্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ভুল পদক্ষেপ নিলে দুই পরাশক্তির মধ্যে সংঘাত বেধে যেতে পারে।
বড় শীর্ষ সম্মেলন
বৃহস্পতিবার সকালে লাল গালিচায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে স্বাগত জানান প্রেসিডেন্ট শি। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ১০টার দিকে ট্রাম্প পৌঁছালে তাকে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা দেওয়া হয়। বড় একটি সামরিক দল গার্ড অব অনার দিয়ে এবং ডজনখানেক শিশু পতাকা নাড়িয়ে তাকে স্বাগত জানায়। লাল গালিচায় করমর্দনের সময় দুই নেতার মধ্যে আন্তরিক পরিবেশ লক্ষ করা যায়। পরে তাদের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে—যা প্রত্যাশার চেয়ে দীর্ঘ। এরপর দুই প্রেসিডেন্ট টেম্পল অব হেভেন পরিদর্শন করেন। দুই নেতা সেখানে করমর্দন করেন। তার পরে 'গ্রেট হল অব দ্য পিপল'-এ প্রবেশ করেন।
লাল গালিচা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ে ট্রাম্প এবং শির শারীরিক ভাষাও ছিল দৃশ্যত বন্ধুত্বপূর্ণ। বেইজিংয়ের বিভিন্ন সড়কে কঠোর নিরাপত্তা সত্ত্বেও মানুষের ভিড় দমানো যায়নি। চীন সফররত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মোটর শোভাযাত্রাটি যখন শহর অতিক্রম করছিল, তখন তাকে এক পলক দেখার জন্য সাধারণ মানুষকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে এবং হুড়োহুড়ি করতে দেখা যায়। আলোচনা কেমন হয়েছে, সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প শুধু এক শব্দে বলেছেন—'চমত্কার'। বেইজিংয়ের এই বৈঠক 'এ যাবত্কালের সবচেয়ে বড় শীর্ষ সম্মেলন' বলেও ব্যাখ্যা করেন ট্রাম্প। ট্রাম্প তাকে দেওয়া 'অভূতপূর্ব ও রাজকীয় সংবর্ধনার' ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, তাকে এমনভাবে স্বাগত জানানো হয়েছে যার কোনো তুলনা হয় না। দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এই প্রথম চীন সফর করেন ট্রাম্প। গত বুধবার রাতে বেইজিং পৌঁছালে তাকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এর আগে ২০১৭ সালের নভেম্বরে তিনি তার প্রথম মেয়াদেও বেইজিং ঘুরে যান এবং তার ঐ সফরের পর মার্কিন কোনো প্রেসিডেন্ট আর দেশটিতে যাননি।
প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায় দুই দেশ
ট্রাম্প বলেন, 'আমাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক রয়েছে। কোনো সমস্যার মুখোমুখি হলে আমরা তা সমাধান করেছি। আমি আপনাকে ফোন করতাম, আপনি আমাকে ফোন করতেন। মানুষ জানে না—যখনই আমাদের কোনো সমস্যা হয়েছে, আমরা খুব দ্রুত তা সমাধান করেছি।' ট্রাম্প আরো বলেন, 'আমি সবাইকেই বলি, আপনি একজন মহান নেতা।' মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, এই সফরে তিনি বিশ্বের সেরাদের (ব্যাবসায়িক নেতাদের) সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, 'আজ এখানে শুধু শীর্ষ ব্যক্তিরাই এসেছেন আপনাকে সম্মান জানাতে।' ট্রাম্প আরো বলেন, 'আপনার সঙ্গে থাকা সম্মানের, আপনার বন্ধু হওয়াও সম্মানের, বলার সঙ্গে তিনি এটাও যোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো হবে।'
ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে ইতিবাচক ফল নিয়ে আশাবাদী জিনপিং। তিনিও ট্রাম্পকে বলেন, 'আসুন, আমরা একসঙ্গে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ গড়ে তুলি। গোটা বিশ্ব আমাদের এই বৈঠকের দিকে তাকিয়ে।' তিনি আরো বলেন, 'আমাদের একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে পরস্পরের সঙ্গী হওয়া উচিত। আমাদের উচিত একে অপরকে সফল ও সমৃদ্ধ হতে সাহায্য করা। বর্তমান যুগে প্রধান শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো কীভাবে একে অপরের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পারে তার সঠিক পথের সন্ধান করা উচিত।'
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং তার স্ত্রী পেং লিউয়ানকে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউজ সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ট্রাম্প ৩০টি প্রধান প্রযুক্তি সংস্থার প্রধান নির্বাহীদের সঙ্গে নিয়ে বেইজিংয়ে এসেছেন এই আশায় যে, চীন আরো আমেরিকান সংস্থার জন্য তার দরজা খুলে দেবে। ট্রাম্পের সঙ্গে এই সফরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা, যাদের মধ্যে টেসলার ইলন মাস্ক ও এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং রয়েছেন। বৈঠকে ইরান যুদ্ধ গুরুত্ব পেয়েছে। যদিও দুই নেতার কেউ-ই এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলেননি। তবে জানা গেছে, বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হরমুজ প্রণালি খোলার বিষয়ে তারা একমত হয়েছেন। তবে কীভাবে সেই কাজটি করা হবে তা জানা যায়নি।
তাইওয়ান নিয়ে প্রশ্ন এড়ালেন ট্রাম্প
গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বৈঠক শেষে ট্রাম্প ও শি একসঙ্গে ৬০০ বছরে পুরোনো টেম্পল অব হেভেনে যান। এটি এমন এক মন্দিরের অংশ, যেখানে প্রাচীনকালে চীনের সম্রাটরা ভালো ফসলের জন্য প্রার্থনা করতেন। টেম্পল অব হেভেনে উপস্থিত সাংবাদিকরা ট্রাম্পকে এ সময় জিগ্যেস করেন যে আলোচনা কেমন চলছে? জবাবে তিনি বলেন, চমত্কার। দ্বিতীয় এক প্রশ্নকারী জানতে চান, তিনি তাইওয়ান নিয়ে কথা বলেছেন কি না। জবাবে ট্রাম্প তার আগের কথার ধারাবাহিকতায় বলেন, 'চমত্কার জায়গা, অবিশ্বাস্য, চীন খুব সুন্দর।' আবার তাকে জিগ্যেস করা হলে তিনি তাইওয়ান নিয়ে কথা বলেছেন কি না, ট্রাম্প সরাসরি সামনে তাকিয়ে থাকেন, শিও একইভাবে সামনে তাকিয়ে থাকেন। তৃতীয়বার প্রশ্নটি করা হয়, যখন দুই নেতা ঘুরে মন্দিরের সিঁড়ির দিকে এগোতে শুরু করেন।
শির 'সতর্কতা'
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাতের বিষয়ে সতর্ক করেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি এটিকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের উদ্ধৃতি অনুযায়ী শি বলেন, এটি সঠিকভাবে পরিচালিত হলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক সাধারণভাবে স্থিতিশীল থাকতে পারে। কিন্তু এটি যথাযথভাবে সামলানো না হলে দুই দেশ মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে, এমনকি সংঘাতেও গড়াতে পারে, যার ফলে সামগ্রিক চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে পৌঁছে যেতে পারে। শি আরো বলেন, 'তাইওয়ানের স্বাধীনতা' তাইওয়ান প্রণালিতে শান্তির সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ঐ প্রণালিতে শান্তিই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সবচেয়ে বড় মিলের ক্ষেত্র।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের একটি নতুন কাঠামো তৈরি করতে পারবে কি না, একসঙ্গে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে আরো স্থিতিশীলতা আনতে পারবে কি না; দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য আরো উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ গড়ে তুলতে পারে কি না—এই প্রশ্নগুলোও তোলেন শি। তিনি আরো বলেন, এগুলোই ইতিহাস, বিশ্ব ও মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—যার উত্তর আপনাকে এবং আমাকে বড় দেশগুলোর নেতা হিসেবে দিতে হবে।
প্রসঙ্গত, তাইওয়ান একটি স্বশাসিত দ্বীপ, যাকে বেইজিং নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে দখল করার সম্ভাবনা নাকচ করেনি। সাম্প্র্রতিক বছরগুলোতে দ্বীপটিকে ঘিরে সামরিক মহড়া বাড়িয়েছে বেইজিং, যা তাইওয়ানের কর্তৃপক্ষ এবং দ্বীপটির মিত্রদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের কাছে ১১ বিলিয়ন বা ১১০০ কোটি ডলারের অস্ত্র বিক্রির ঘোষণা দেয়। ঐ সময় বেইজিং এর নিন্দা করে। —বিবিসি, সিএনএন ও আলজাজিরা
Comments