মোংলার ঠাকুরানী খাল: এবার কি ভাঙবে দখলের দেয়াল?
মোংলা শহরের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী ঠাকুরানী খাল? এক সময় যে খাল দিয়ে বড় বড় নৌকা চলত, আজ সেখানে প্রভাবশালী দখলদারদের পাকা দালান আর ময়লার ভাগাড়। বছরের পর বছর আশ্বাস আর প্রতিশ্রুতির ভিড়ে খালটি এখন মোংলাবাসীর জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
তবে এবার বর্ষার আগেই সেই 'গলার কাঁটা' সরাতে মাঠে নেমেছে প্রশাসন। সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
রোববার মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সামনে এক কঠোর বার্তা দিয়েছেন।
তিনি সাফ জানিয়েছেন, প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই ঠাকুরানী খাল উদ্ধার করতে হবে। খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফেরাতে এক সপ্তাহের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি চায় মন্ত্রণালয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, ঠাকুরানী খালের দুই পাড় দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে দোকানপাট ও বসতবাড়ি। কোথাও কোথাও খালটি সরু হতে হতে এখন ড্রেনের চেয়েও ছোট হয়ে গেছে। শহরের সব বর্জ্য এই খালে ফেলায় তৈরি হয়েছে অসহনীয় দুর্গন্ধ। এতে বর্ষা আসতেই সামান্য বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় মোংলার অধিকাংশ এলাকা। পানি নামার পথ না থাকায় মশার বংশবিস্তার এখন শহরবাসীর প্রধান উদ্বেগের কারণ।
স্থানীয় বাসিন্দা রাশেদা বেগম ক্ষোভের সঙ্গে বলছিলেন, "ভোটের আগে সবাই বলে খাল ঠিক হবে। কিন্তু বৃষ্টি হলেই আমাদের হাঁটু পানিতে থাকতে হয়। ঘরে পানি ঢোকে, চুলা জ্বলে না। আমরা শুধু আশ্বাস চাই না, এবার কাজ দেখতে চাই।"
মোংলার পরিবেশ আন্দোলনের অন্যতম মুখ নূর আলম শেখ বলেন, "ঠাকুরানী খাল এই শহরের ফুসফুস। এটি বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে মোংলা শহরকে গলা টিপে মারা। অতীতে বহুবার খনন ও উচ্ছেদের নাম করে অর্থ ব্যয় হয়েছে, কিন্তু প্রভাবশালী দখলদারদের ছোঁওয়া হয়নি। এবার প্রতিমন্ত্রী নিজে নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা চাই এর স্থায়ী সমাধান।"
প্রতিমন্ত্রীর এই কঠোর নির্দেশের পর নড়েচড়ে বসেছে বাগেরহাট জেলা প্রশাসন ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ। খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের উপস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে দ্রুত সমন্বিত অভিযানের ছক আঁকতে বলা হয়েছে।
প্রশাসনের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই খালের ওপর থাকা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে বুলডোজার নামতে পারে।
তবে স্থানীয়দের মনে এখনো সংশয় কাটছে না। তারা বলছেন, অতীতেও এমন তোড়জোড় দেখা গেছে, কিন্তু মাঝপথে অদৃশ্য কারণে উচ্ছেদ থমকে গেছে। এবারও কি সেই পুরনো গল্পের পুনরাবৃত্তি হবে, নাকি সত্যিই দৃশ্যমান হবে বদলে যাওয়া ঠাকুরানী খাল—সেই অপেক্ষায় দিন গুনছে মোংলাবাসী।
Comments