মাদকাসক্তি থেকে ঘুষ বাণিজ্য বিএসসি সচিব শাহেদুলের বিরুদ্ধে বিস্তৃত দুর্নীতির অভিযোগ
বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন (বিএসসি) দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় বাণিজ্যিক সংস্থা, যা মূলত সমুদ্রপথে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মালামাল পরিবহনের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি পদ ও দায়িত্ব রাষ্ট্রীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ায় এখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত।
কিন্তু এমন একটি কৌশলগত ও আস্থার সেক্টরে যখন দায়িত্বশীল পদে থাকা ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তখন তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং সামগ্রিক প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।
বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন-এর বর্তমান সচিব ও সরকারের উপসচিব আবু সাফায়াৎ মুহম্মদ শাহেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ভূমি জালিয়াতি এবং নৈতিক স্খলনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পক্ষ থেকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর পাঠানো এক লিখিত অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মাদকাসক্তি, আর্থিক অনিয়ম এবং মানসিক ভারসাম্যহীন আচরণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ধ্বংসের বিস্তর অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, শাহেদুল ইসলাম বিএসসির মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে খুলনার কেডিএ এভিনিউ এলাকায় কর্পোরেশনের ১১ দশমিক ৭৩ কাঠা জমি 'হোস্টন' নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে নামমাত্র মূল্যে লিজ দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেন। পরে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে বিএসসি বোর্ড ওই চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দিলেও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একইভাবে খুলনার বয়রা এলাকায় বিএসসির আরও প্রায় ৪০ কাঠা জমি একই প্রক্রিয়ায় লিজ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
বিভিন্ন অনিয়ম ও অভিযোগের কারণে এক পর্যায়ে তাকে বিএসসি থেকে বদলি করে ঢাকা ওয়াসা-তে পাঠানো হয়। সেখানে দায়িত্ব পালনকালে ঠিকাদারদের বিল আটকে রেখে ঘুষ দাবি করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়, অতিষ্ঠ কয়েকজন ঠিকাদার একসময় তাকে অফিস কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরবর্তীতে প্রভাব খাটিয়ে তিনি আবারও বিএসসিতে সচিব হিসেবে ফিরে আসেন।
বিএসসিতে পুনরায় যোগদানের পর তিনি সরকারি সফর ও ভ্রমণকে 'আয়ের উৎসে' পরিণত করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। অভিযোগ অনুযায়ী, অপ্রয়োজনীয় ঢাকা সফরের নামে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টাকার ভ্রমণ বিল উত্তোলন করা হচ্ছে। আইনজীবীদের সঙ্গে সাক্ষাতের অজুহাতে নিয়মিত ঢাকা ও খুলনা সফর করলেও চট্টগ্রামের মামলাগুলো তিনি গুরুত্ব দেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অধীনস্থদের ব্যবহার করে আইনজীবীদের সহকারীদের মাধ্যমে ভুয়া ভাউচার তৈরি করে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে চট্টগ্রামের একটি ব্যারিস্টার কলেজের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে শিক্ষকদের কাছ থেকে ঘুষ দাবি করাকে কেন্দ্র করে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে তার তীব্র বাকবিতণ্ডা এবং হাতাহাতির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। এছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হজ বা চিকিৎসাজনিত বিদেশ সফরের জিও জারির ক্ষেত্রেও মোটা অংকের ঘুষ দাবি করার অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, শাহেদুল ইসলাম অফিস চলাকালীন নিজ কক্ষে মাদক সেবন করেন। তার অনৈতিক সুবিধা দিতে অস্বীকৃতি জানানো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বেনামে 'উড়ো চিঠি' পাঠিয়ে হয়রানি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। দুর্নীতির অর্থে তিনি ঢাকার সেগুনবাগিচায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন বলেও অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো ওই আবেদনে বিএসসির বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শাহেদুল ইসলামের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের তদন্ত, দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান এবং তাকে বর্তমান পদ থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছেন। অভিযোগের অনুলিপি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছেও পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক বলেন, অভিযোগ গুলো বেশ পুরোনো। বিএসসির পক্ষ থেকে তাকে সার্বিক নজরদারিতে রাখা হয়েছে। যদি কখন এমন দুর্নীতির বিষয় উঠে আসে এবং সত্যতা প্রমাণিত হয় সেক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
Comments