অন্তবর্তী সরকাররের টিকা ক্রয়ে অনিয়ম ও ব্যর্থতায় শিশুর মৃত্যূ, তদন্ত হবে কি?
বাংলাদেশে এ মুহুর্তে সবচেয়ে বড় দুর্যোগ হাম রোগের আক্রমণে শিশু মৃত্যূ। পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগজনক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে। এতোদিন এ নিয়ে নানারকম কথা বলা হলেও এখন বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে যে, এতো শিশু মৃত্যুর পুরো দায় অধ্যাপক ইউনূসের অন্তবর্তী সরকারের। বিষয়টি সামনে এসেছে আন্তর্জাতিক সায়েন্স ম্যাগাজিন- এর রিপোর্ট হওয়ার পর। ম্যাগাজিনটি বলছে, ইউনূসের সরকার আমলে টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থার হঠাৎ পরিবর্তন ও ব্যর্থতায় দেশে ভয়াবহ টিকার সংকট তৈরি হয়েছে।
মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত ৩২,০০০-এর বেশি সন্দেহভাজন সংক্রমণ এবং ৩০০ এর মতো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু। ইউনূস সরকারের সৃষ্ট জটিলতার কারণেই টিকাদান ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে।
হামের টিকা সংকটকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে,তা নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়;বরং এটি জনস্বাস্থ্যের প্রতি একটি সরকারের অবহেলার দৃষ্টান্ত। এই প্রেক্ষাপটে একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখন শুধু প্রয়োজনই নয়, বরং জরুরি।
প্রথম প্রশ্নটি আসে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহের একটি প্রতিষ্ঠিত ও পরীক্ষিত ব্যবস্থা চালু ছিল। এই ব্যবস্থাকে হঠাৎ ভেঙে উন্মুক্ত দরপত্রের পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অধ্যাপক ইউনূসের অন্তবর্তী সরকার। আর এর ফলেই সৃষ্টি হলো টিকার সংকট এবং মারা গেলো ৩০০ এর বেশি শিশু। প্রশ্ন আসে, কোন ব্যবসায়ীকে কাজটা দিতে চেয়েছিল ইউনূস সরকার?
ইউসূসের স্বাস্থ্য বিষয়ক সহাকারী বলছেন তারা নাকি 'বৈপ্লবিক' পরিবর্তন আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে এটি যে যুক্তিযুক্ত ছিল না সেটিই প্রমাণ হলো আজ। জনস্বাস্থ্য খাতে নীতিগত পরিবর্তন কখনোই শুধুমাত্র তাত্ত্বিক আদর্শের ভিত্তিতে নেওয়া যায় না; এখানে বাস্তবতা, সময়োপযোগিতা এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন হলো-এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কি পর্যাপ্ত সমীক্ষা,সক্ষমতা যাচাই বা ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়েছিল?
জনস্বাস্থ্যের মতো সংবেদনশীল খাতে দ্রুততা একটি মৌলিক উপাদান। টিকা সংগ্রহে বিলম্ব মানে সরাসরি মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা। ইমারজেন্সি প্রোকিউরমেন্ট সিস্টেমের একটি বড় সুবিধা হলো-এটি দ্রুত সিদ্ধান্ত ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে। সেই জায়গা থেকে হঠাৎ নিয়মতান্ত্রিক,সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ায় চলে যাওয়া বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে,তা বিবেচনা করা জরুরি ছিল। কিন্তু তারা তা করেন নি।
আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন সায়েন্স স্পষ্ট করেই বলেছে–ইউনিসেফের তীব্র আপত্তি সত্বেও ইউনূস সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা ও তার সহকারীসহ অন্য কর্মকর্তারা টিকা কেনার প্রক্রিয়া বদলে ফেলেন। এ নিয়ে অনেকেই কথা বলছেন এখন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কন্যা শামারুহ মির্জা ফেসবুকে লিখেছেন, ইউনূস সরকারের এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে ফেসবুকে লিখেছেন – সেই সিদ্ধান্তের কারণে টিকা সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটে, ফলে দেশজুড়ে টিকার ঘাটতি তৈরি হয়,পরে ওয়েবসাইট থেকে ডাটা পর্যন্ত রিমুভ করা হয়েছে! এটা শুধু ইউনুস সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অযোগ্যতা,অবহেলা বা ভুল নয়,এটা একটি অপরাধ।
আল জাজিরার প্রখ্যাত সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের ফেসবুকে লিখেছেন – প্রায় ৩০০ বাচ্চা এখন পর্যন্ত মারা গেছে – নাকি বলবো ইউনুস সরকারের হটকারী সিদ্ধান্ত তাদের হত্যা করেছে?
আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে যদি আগেই সতর্কতা দেওয়া হয়ে থাকে,তাহলে তা উপেক্ষা করার কারণ কী? নীতিনির্ধারণে মতবিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব না দেওয়া একধরনের অবহেলা, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এই প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে-কার স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত? সাধারণত রাষ্ট্র কোনো বড় ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নেয় না যদি না এর পেছনে কোনো শক্তিশালী যুক্তি বা স্বার্থ থাকে। অথচ এখানে যে যুক্তিগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে-যেমন নিরপেক্ষতা বজায় রাখা বা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকা-সেগুলো বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। কারণ বাস্তবে দেখা গেছে,অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যান্য ক্ষেত্রেও সব প্রোকিউরমেন্ট উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে হয়নি। ফলে এই যুক্তিগুলো আংশিক এবং নির্বাচিতভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে বলেই মনে হয়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বচ্ছতা। দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক সমাজ যে 'শ্বেতপত্র' প্রকাশের দাবি জানিয়ে আসছে,তা এখন আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। একটি নিরপেক্ষ শ্বেতপত্রই পারে এই সিদ্ধান্তের পেছনের প্রক্রিয়া, যুক্তি এবং দায় নির্ধারণ করতে। এতে শুধু অতীতের ভুল চিহ্নিত হবে না, ভবিষ্যতের জন্যও একটি দিকনির্দেশনা তৈরি হবে।
সবশেষে, এই পুরো ঘটনাটি আমাদের একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়-জনস্বাস্থ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে অবহেলা বা ভুলের কোনো জায়গা নেই। এখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে থাকতে হবে সুস্পষ্ট যুক্তি, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং সর্বোপরি মানুষের জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা। এই দায় এড়ানোর সুযোগ কারও নেই অন্তবর্তী সরকারের।
তাই এখন সবচেয়ে জরুরি হলো সত্য উদ্ঘাটন। দোষী যেই হোক,তার দায় নির্ধারণ করতে হবে। কারণ এই দায় শুধু প্রশাসনিক নয়-এটি নৈতিক, মানবিক এবং রাষ্ট্রিক দায়ও বটে।
Comments