বার্লিনে প্রয়াত কবি দাউদ হায়দারের সমাধিফলক উন্মোচন
জার্মানির রাজধানী বার্লিনে পালিত হলো কবিতা লেখার অপরাধে বাংলাদেশের প্রথম নির্বাসিত কবি প্রয়াত দাউদ হায়দারের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। এই উপলক্ষে রোববার ২৬ এপ্রিল বিকেলে বার্লিনের সর্বস্তরের প্রবাসীদের উদ্যোগে নগরীর নয়াকোলনের সেন্ট মিশায়েল কবরস্থানে কবির সমাধিস্থলে তাঁর নামে সমাধিফলকের উন্মোচন করা হয়। ফলকটি উন্মোচন করেন ডয়েচে ভেলের বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান কবির দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও বন্ধু আব্দুল্লাহ আল ফারুক।
পরে সমাধিতে সর্বস্তরের প্রবাসীদের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে স্থানীয় একটি মিলনায়তনে কবিকে নিয়ে স্মৃতিচারণের আয়োজন করা হয়। সংস্কৃতিকর্মী তন্বী নওশিন ও মাইন চৌধুরী পিটু'র সঞ্চালনায় স্মৃতি সভায় কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় কবিতা, গান আর স্মৃতিচারণ দিয়ে। প্রয়াত কবিকে নিয়ে গান পরিবেশন করেন শিল্পী মিতালী মুখার্জী ও উর্মিমালা।
কবি দাউদ হায়দারকে নিয়ে লেখা কবিতা আবৃত্তি করেন তরুণ কবি দেবাশীষ তিওয়ারী। অনুষ্ঠানে প্রয়াত কবি দাউদ হায়দারকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন বার্লিনে তারই একান্ত সৃহৃদ, সহচর ও সমাজ ও সংস্কৃতিকর্মী মাইন চৌধুরী পিটু, ডয়েচে ভেলের বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান আব্দুল্লাহ আল ফারুক, কবির একান্ত আস্থাভাজন সারনাথ ব্যানার্জী, মুক্তিযোদ্ধা মীর মোনাজ হক
সাংবাদিক শরাফ আহমেদ, মিলন, মামুন আহসান খানসহ অনেকে। এসময় কবির রচনা সমগ্র ও তাঁর সংগ্রহে থাকা নানা লেখকের বই সংরক্ষণে বার্লিনে একটি পাঠাগার করার পরিকল্পনার কথা জানান প্রবাসীরা।
একাধারে লেখক, কলামিস্ট, চিন্তাবিদ ও দার্শনিক দাউদ হায়দার ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাসিত কবি। যিনি ১৯৭৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন "দৈনিক সংবাদ" পত্রিকায় তার লেখা কবিতা "কালো সূর্যের কালো জ্যোৎস্নায় কালো বন্যায়" প্রকাশিত হয়। এরপর "ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের" মিথ্যা অভিযোগে তার বিরূদ্ধে মামলা হয়। ধর্মীয় মৌলবাদীরা তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলে ১১ মার্চ তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কবিতা লেখার অপরাধে জ্বালিয়ে দেয়া হয় তাঁর বসতবাড়ি। জীবন বাঁচাতে ১৯৭৪ সালের ২০ মে কবিকে জেল থেকে মুক্তি দিয়েই পরদিন বিশেষ এক বিমানে করে ভারতের কলকাতায় পাঠানোর ব্যাবস্থা করেন তৎকালীন সরকার । সেই থেকে শুরু হয় কবির নির্বাসিত জীবন। এরপর ভারতে বেশকিছু দিন থাকার পর সাহিত্যে নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্ত জার্মান কবি ও সাহিত্যিক গুইন্টার গ্রাসের বিশেষ চেষ্টায় ১৯৮৭ সালে জার্মানিতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেন দাউদ হায়দার। তারপর থেকেই তিনি জার্মানিতে বসবাস করতেন। নানা সময়ে তিনি দেশে ফিরতে চাইলেও বাংলাদেশের কোন সরকারই তাঁকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেয়নি।
প্রয়ানের বেশ কিছুদিন আগে থেকে শারীরিক নানা জটিলতা, দেশে ফিরতে না পারার হতাশা, একাকিত্ব, আপন ভাই বোন, পরিবার পরিজন, আত্মীয় স্বজনদের দেখা না পাওয়ার কষ্টে ভুগছিলেন কোনদিন সংসার না করা কবি দাউদ হায়দার।
গেল ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বার্লিনের বাসার সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে তিনি মাথায় প্রচন্ড আঘাত পান। এরপর বেশ কিছুদিন তাকে হাসপাতালের আইসিইউতে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়। শরীরে খানিকটা স্থিতিশীলতা আসার পর হাসপাতাল ছাড়লেও আর সুস্থ জীবনে ফিরতে পারেননি।
শেষ পর্যন্ত শনিবার ২৬ এপ্রিল ২০২৫ সালে জার্মানির রাজধানী বার্লিনের একটি বয়স্ক নিরাময় কেন্দ্রে ইহলোক ত্যাগ করেন রাষ্ট্রের অসত্য, অসুন্দর, ধর্মান্ধ মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়া দ্রোহের কবি দাউদ হায়দার।
Comments