‘প্রথম জন্মদিনে ছেলে উপহার পেলো বাবার লাশ’
সোমবার ২৭ এপ্রিল একমাত্র সন্তান অব্যয় বৈরাগীর প্রথম জন্মদিন। অনেক পরিকল্পনা ছিলো একমাত্র ছেলের জন্মদিন পালন নিয়ে। কিন্তু সেই পরিকল্পনা আর পূরণ করতে পারলেন না কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী। জন্মদিন পালনের আগে গত ২৪ এপ্রিল নিঁখোজ ও ২৫ এপ্রিল বুলেটের লাশ উদ্ধার করা হয়।
অথচ, ছেলে আর নাতির জন্মদিন নিয়ে কত স্বপ্ন ছিলো বুলেট ও তার পরিবারের সদস্যদের। প্রথম জন্মদিনে ছেলে উপহার পেলো বাবার লাশ। জন্মদিন পরিণত হলে এক রাশ বিষাদে। নিখোঁজের দুই দিন আগে বিবাহ বার্ষিকী ছিল বুলেটের।
রবিবার (২৬ এপিল) বিকেল সাড়ে ৫টা| বুলেটের লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার নিজ গ্রামের বাড়ী ডুমুরিয়া ইউনিয়নের ডুমুরিয়া উত্তরপাড়া গ্রামের বাড়ির উঠানে ঢুকতেই মুহূর্তেই কান্না আর আহাজারিতে ভেঙে পড়ে পরিবার-পরিজনসহ পুরো গ্রাম। স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস| যে ছেলে একসময় এই উঠানে হেসে-খেলে বেড়াতো, সেই ছেলেই আজ নিথর হয়ে ফিরেছে কাফনে মোড়ানো লাশ হয়ে। এ সময় স্বামীর লাশবাহী গাড়ির সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী উর্মি হীরা।
বুলেটের বাবা সুশীল বৈরাগী ছেলেকে মানুষ করতে নিজের শেষ সম্বল ২৭ শতক ধানের জমি বিক্রি করেছিলেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করে চালিয়েছেন সংসার আর ছেলের পড়াশোনা| মা লিলিমা বৈরাগী নিজের কানের স্বর্ণের দুল বিক্রি করে ছেলের ভবিষ্যৎ গড়ার পথ খুলে দিয়েছিলেন।
মায়ের সেই লুকানো কষ্টের কথা বলতে গিয়ে তিনি ছেলেকে বলতেন, তুই বন্ধুদের কাছে বলবি না, তোর বাবা অন্যের জমিতে কাজ করে। কিন্তু বুলেট গর্ব করে বলত, আমার বাবা অন্যের জমিতে কাজ করে আমাকে পড়ান, এটাই আমার সবচেয়ে বড় গর্ব।
অভাবের সংসারে বড় হলেও বুলেটের স্বপ্ন ছিল আকাশে ছোয়ার। ছেঁড়া জামা নিজেই সেলাই করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন বুলেট। বাড়ি ফিরে হাসতে হাসতেই বলতেন, আমি নিজেই সেলাই করে পরে যাই। জীবনের সেই সংগ্রামী ছেলেটিই আজ নির্মমভাবে নিহত।
বুলেটের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া বহুমুখী উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, গোপালগঞ্জ হাজী লালমিয়া সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক সম্পন্ন করেন। কর্মজীবন শুরু করেন খাদ্য অধিদপ্তরে, পরে ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার হিসেবে ঢাকা কাস্টমস কার্যালয়ে যোগ দেন। সর্বশেষ কর্মরত ছিলেন কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে। ২৪ এপ্রিল পরিবারের সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলার পর হঠাৎই বন্ধ হয়ে যায় তাঁর ফোন। পরদিন সকালে কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকায় সড়কের পাশ থেকে উদ্ধার হয় তাঁর লাশ।
শুধু পরিবার আর স্বজনরাই নয়, বুলেটকে হারিয়ে শোকে স্তব্দ পুরো গ্রাম। বুলটকে এক নজড় দেখেতে ভীড় করছেন গ্রামবাসী ও সহপাঠিরা। আসামীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবী তাদের।
বুলেটের বাড়ীতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির উঠানে আমগাছের ছায়ায় নীরবে বসে আছেন স্বজনরা| কেউ কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। বৃদ্ধ দাদি নাতির মারা যাওয়ার খবর শুনে বাকরুদ্ধ। পাশেই কাঠের একটি বাক্স তৈরি করা হচ্ছে, সেই বাক্সেই চিরদিনের জন্য শুয়ে থাকবেন বুলেট।
চায়ের দোকানে বসে থাকা গ্রামবাসীরাও স্তব্ধ। কেউই বিশ্বাস করতে পারছেন না, হাসিখুশি, ভদ্র আর পরিশ্রমী ছেলেটির এমন পরিণতি হতে পারে।
স্ত্রী উর্মি হীরা বলেন, আমি শুধু আমার স্বামীর রক্তাক্ত শরীর দেখেছি। অনেকে অনেক কথা বলছেন। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট কী আসবে, তদন্ত কী বলবে—এসবের বাইরে আমার একটাই প্রশ্ন, আমার স্বামীর সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল? আমি শুধু সেটার উত্তর চাই।
নিহতের মা নিলীমা বৈরাগী ছেলের হত্যার বিচার দাবি করে বলেন, আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। আমি খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
ষাটোর্ধ্ব কাকা বিমল বৈরাগী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, জীবনে কাউরে নখের আঁচড়ও দেয় নাই, কেউ তার দিকে আঙুলও তোলে নাই। সেই শান্ত ছেলেটার লাশ আজ রাস্তায় পড়ে থাকতে হলো! আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে...।
কাকা সুশান্ত বৈরাগী জানান, একটি ছেঁড়া জামা নিজেই সেলাই করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন বুলেট। বাড়ি ফিরে হাসতে হাসতেই বলতেন, আমি নিজেই সেলাই করে পরে যাই।
কাকাতো বোন দুলালী রানী মণ্ডল কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, দাদার ছেলের এক বছর পূর্ণ হবে সোমবার। জন্মদিন করতে চট্টগ্রাম থেকে ফিরছিল। বড় চাকরি করাই কি তার জীবনের কাল হলো?
বন্ধু তমার কণ্ঠেও আকুতি। তিনি বলেন, আমার বন্ধুকে যারা এভাবে কষ্ট দিয়ে মেরেছে, তাদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।
একটি সম্ভাবনাময় জীবনের এমন করুণ সমাপ্তি শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো গ্রামকেই স্তব্ধ করে দিয়েছে। এখন সবার একটাই দাবি—বুলেট বৈরাগীর হত্যার রহস্য উদঘাটন হোক, দোষীরা দ্রুত আইনের আওতায় আসুক।
Comments