১৩ বছরেও শেষ হয়নি বিচার
সাভারে ১৩ বছর আগে রানা প্লাজা ধসে এক হাজার ১৩৬ জন পোশাককর্মীর মৃত্যু হয়। এ দুর্ঘটনায় পুলিশের করা হত্যা মামলাটি ২০২৪ সালের ১৫ জানুয়ারি ছয় মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে সংশ্লিষ্ট আদালতকে নির্দেশ দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এই নির্দেশনার পর ২৬ মাস পার হলেও এখনো মামলাটির নিষ্পত্তি হয়নি। আগের মতোই মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে আটকে রয়েছে।
এই মামলার মতো ইমারত নির্মাণ আইনের মামলাও নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিচারকাজ ঝুলে আছে। আর এ মামলায় ১৩৫ জন সাক্ষীর কারোর সাক্ষ্যগ্রহণ এখনো হয়নি। কবে নাগাদ বিচারকাজ শেষ হবে নির্দিষ্ট করে কেউ বলতে না পারলেও রাষ্ট্রপক্ষের প্রত্যাশা দ্রুতই শেষ হবে।
ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর ফয়সাল মাহমুদ বলেন, 'শেখ হাসিনার সরকারের আমলে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করা হয়েছে।
তাদের সদিচ্ছার অভাবে মামলার বিচারকাজ এগোয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মামলা শেষ করতে কোনো উদ্যোগও নেওয়া হয়নি। তবে হাসিনা সরকার পতনের পর মামলাটি নিষ্পত্তিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। হত্যা মামলাটিতে ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত ১৪৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে।
আশা করা যায়, এ বছরের মধ্যে বিচারপ্রক্রিয়া শেষে রায় ঘোষণা করা হবে।'
আসামি সোহেল রানার আইনজীবী মাসুদ খান খোকন বলেন, 'সাক্ষ্য-প্রমাণে আসামি সোহেল রানা নির্দোষ প্রমাণিত হলে খালাস পাবেন, না হলে সাজা হবে, এটাই চিরাচরিত নিয়ম। তবে মামলার সাক্ষ্য তো শেষ হচ্ছে না। রানা ১৩ বছর ধরে বিনা বিচারে কারাগারে রয়েছেন। যদি তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পান, তাহলে এই ১৩ বছর কে তাঁকে ফিরিয়ে দেবে? সাক্ষ্য-প্রমাণে এখন পর্যন্ত রানার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আনতে পারেনি।
মামলার বিচারে দীর্ঘসূত্রতায় ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আমরা চাই, বিচার দ্রুত শেষ হোক। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক।'
বর্তমানে হত্যা মামলাটি ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। মামলাটির ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র ১৪৫ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। সর্বশেষ গত ৩০ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। ওই দিন আটজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন আদালত। একই সঙ্গে আগামী ৩০ এপ্রিল পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে।
অন্যদিকে ইমারত আইনের মামলাটি ঢাকার অতিরিক্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচারাধীন। সর্বশেষ গত ২০ এপ্রিল এই মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু ওই দিন কোনো সাক্ষী আদালতে হাজির হননি। এ জন্য আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী দিন ধার্য করা হয়েছে।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে ধসে পড়ে সাভারের রানা প্লাজা। এর নিচে চাপা পড়েন সাড়ে পাঁচ হাজার পোশাক শ্রমিক। ওই ঘটনায় এক হাজার ১৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আহত ও পঙ্গু হন প্রায় দুই হাজার শ্রমিক। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে দুই হাজার ৪৩৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সাভার থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ওয়ালী আশরাফ ভবন নির্মাণে 'অবহেলা ও ত্রুটিজনিত হত্যা' মামলা করেন। ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মামলার ৪১ আসামির মধ্যে চারজন মারা গেছেন। তাঁদের বাদ দিয়ে হত্যা মামলায় এখন আসামির সংখ্যা ৩৭। এঁদের মধ্যে ২৫ জন জামিনে এবং ১১ জন পলাতক রয়েছেন। একমাত্র আসামি সোহেল রানা কারাগারে।
একই ঘটনায় ইমারত নির্মাণ আইন না মেনে ভবন নির্মাণ করায় রাজউকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হেলাল উদ্দিন সাভার থানায় আরেকটি মামলা করেন। ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর ভবনের মালিক সোহেল রানাসহ ১৮ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মামলায় সাক্ষী করা হয় ১৩৫ জনকে। ২০১৬ সালের ১৪ জুন ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমান আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।
ইমারত আইনের মামলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ইশতিয়াক হোসেন জিপু বলেন, 'মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে থাকলেও এখন পর্যন্ত কারো সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়নি। সাক্ষীদের বিরুদ্ধে অজামিনযোগ্য পরোয়ানা পাঠানো হলেও তাদের আদালতে হাজির করা যাচ্ছে না। সাক্ষী না এলে তো বিচার হবে না। তবে আমরা চেষ্টা করছি দ্রুত সময়ে সাক্ষ্য নিয়ে মামলাটি নিষ্পত্তি করতে।'
দুই মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা, মা মর্জিনা বেগম, সাভার পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার হাজি মোহাম্মদ আলী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক (আর্কিটেকচার ডিসিপ্লিন) এ টি এম মাসুদ রেজা, প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসাইন, সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র মো. রেফাতউল্লাহ, সাভার পৌরসভার সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়, নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, সাভার পৌরসভার সাবেক টাউন প্ল্যানার ফারজানা ইসলাম, লাইসেন্স পরিদর্শক মো. আব্দুল মোত্তালিব, পৌরসভার সাবেক সচিব মর্জিনা খান, সাবেক সচিব মো. আবুল বাশার, ফ্যান্টম অ্যাপারেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আমিনুল ইসলাম, নিউ ওয়েব বটমস লিমিটেডের এমডি বজলুস সামাদ এবং ইথার টেক্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. আনিসুর রহমান।
Comments