খুনের খবর কি 'সাধারণ'খবরে পরিণত হচ্ছে?
দেশের পাঁচ জেলা নওগাঁ, কক্সবাজার, কুষ্টিয়া, ফেনী ও নরসিংদীতে একই রাতে ধারাবাহিক হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এই পাঁচ জেলার ঘটনা একদম সাম্প্রতিক। তবে পত্রিকার পাতায় একসঙ্গে দেখার পর বা একই শিরোনামে সংবাদ হওয়ার পর দেখলে একটি বড় চিত্র স্পষ্ট হয়। সেটি হলো সহিংসতা ও নৃশংসতা। আরো একটি বিষয় হচ্ছে, সেটি ছড়িয়ে পড়েছে ব্যাপক আকারে। উপরে যেই বিশ্লেষণটা দিলাম সেই পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকটি ঘটনার বিশ্লেষণ করা যাক।
নওগাঁর নিয়ামতপুরে এক পরিবারের চারজনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। স্বামী-স্ত্রীর গলা কেটে, আর দুই শিশুকে মাথায় আঘাত করে। দেয়ালে হুমকিমূলক লেখা, পুলিশ বলছে এটা জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ঘটতে পারে। ব্যক্তিগত শত্রুতা কতটা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে তার উদাহরণ এটি। একইসঙ্গে আমরা কতোটা অসহিষ্ণু সেটাও মনে করিয়ে দেয়।
কক্সবাজারের টেকনাফে দুর্গম পাহাড়ে তিনজনের লাশ উদ্ধার হয়। তাদের বিরুদ্ধে অপহরণ, মানব পাচার ও অপরাধচক্রের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, অপরাধীদের নিজেদের দ্বন্দ্বেই এই হত্যাকাণ্ড।
কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে ছোট ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে বড় ভাই নিহত। এটা টাকা ও নেশাজনিত বিরোধ।
ফেনীর দাগনভূঞায় ঘটেছে উল্টো ঘটনা। বড় ভাইয়ের আঘাতে ছোট ভাইয়ের মৃত্যু, পারিবারিক ঝগড়া থেকে এটি শুরু হলেও মুহূর্তেই প্রাণঘাতি সহিংসতা।
নরসিংদীতে একটি টেক্সটাইল মিলের তত্ত্বাবধায়ককে কুপিয়ে হত্যা করা হয় সড়কের পাশে। যেটির কারণ এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, তবে আক্রমণটি যে পরিকল্পিত সেটি বোঝা যাচ্ছে।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত তথ্য থেকে চলতি বছরের খুনের চিত্রটি যদি আমরা দেখি-
চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনেই ঢাকায় অন্তত ১৬টি খুন
জানুয়ারি–মার্চ এই তিন মাসে রাজধানীতে ১০৭টি হত্যাকাণ্ড
o মার্চে: ৩৩
o ফেব্রুয়ারিতে: ৩৮
o জানুয়ারিতে: ৩৬
• সারা দেশে জানুয়ারি–মার্চে মোট ৮৫৪টি খুন
o জানুয়ারি: ২৮৭
o ফেব্রুয়ারি: ২৫০
o মার্চ: ৩১৭
এই পরিসংখ্যানের সংখ্যা দেখে হয়তো খুব বেশি মনে দাগ কাটবে না। কিন্তু ঘটনার ভয়াবহতার বর্ণনা শুনে আঁতকে উঠতে হয়।
খুন এখন গ্রাম-শহর বিভাজন মানছে না। নওগাঁয় গ্রামীণ জমি বিরোধ যেমন খুনোখুনির কারণ হচ্ছে, তেমনি ঢাকায় সংগঠিত সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির কারণে হত্যাকাণ্ড বাড়ছে। অর্থাৎ সহিংসতা পুরো দেশজুড়েই বিস্তৃত।
দ্বিতীয়ত, অপরাধগুলো হচ্ছে সংগঠিতভাবে। পুলিশ বলছে, জামিনপ্রাপ্ত ও পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা বিদেশে বসেই চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং ভয়ভীতি তৈরি করছে। তারা ফোনে হুমকি দিচ্ছে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে চাঁদা দাবি করছে আর অস্বীকার করলে সরাসরি হামলা বা হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে।
তৃতীয়ত, অপরাধের একটি অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছে। বাজার, ফুটপাত, টেন্ডার। পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে সবখানেই চাঁদাবাজি থেকে বিপুল অর্থ উঠছে, যা আবার বিদেশে পাচার হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এই অর্থই অপরাধচক্রকে টিকিয়ে রাখছে এবং সহিংসতা বাড়াচ্ছে। যেটি আসলে বলা হয়ে থাকে যুগ যুগ ধরে চলছে।
চতুর্থত, ঢাকার ক্ষেত্রে শহরে আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এখন বড় কারণ। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় একাধিক গ্রুপ সক্রিয়, যারা এলাকায় নিয়ন্ত্রণ নিতে গিয়ে সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। মোহাম্মদপুরসহ কিছু এলাকায় সাম্প্রতিক খুনগুলো সরাসরি এই আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত।
গেলো ৩ মাসের হত্যাকাণ্ড নিয়ে পত্রিকাগুলোতে পুলিশ যে ভাষ্য দিয়েছেন সেখোনকার বক্তব্যগুলো তুলে ধরছি, তাদের মতে,
সব হত্যাকাণ্ডের পেছনে একক কারণ নেই, পারিবারিক বিরোধ, ডাকাতি, সংগঠিত অপরাধ। জামিনে থাকা ও পলাতক সন্ত্রাসীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখছেন তারা। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত অভিযানও চলছে।
তাদের দাবি, যে কেউ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।
সংবাদপত্রগুলো এটার একটা মনোবিশ্লেষণও দিয়েছে। সেখান থেকে যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা হলো খুন বাড়ছে কারণ একটাই নয়; বরং একাধিক স্তরের সংকট একসঙ্গে কাজ করছে। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, সংগঠিত অপরাধচক্র, অর্থনৈতিক চাপ ও দ্রুত অর্থের লোভ, সন্ত্রাসীদের পুনরুত্থান ও প্রভাব। তাই একথা বলা যায়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একই সঙ্গে প্রয়োজন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিরোধ। নইলে সহিংসতা যেমন বাড়বে তেমনি এসব খবরও একসময় গা সওয়া হয়ে যাবে। আর সেটিই হবে সবচেয়ে বিপদের কারণ।
Comments