জ্বালানি তেল সংকটে অর্থনীতিতে দুষ্টচক্রে বাংলাদেশ
সরকার ক্ষমতা নেবার দুই মাসের মধ্যে তেলের বিপাকে পড়েছে। একে শুধু পাম্পে তেলের ঘাটতি মনে করলে ভুল হবে। এটা এক জটিল দুষ্ট চক্র, যার শুরুটা যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দর বাড়া থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আমদানি খরচ বাড়িয়েছে, সরবরাহ কমিয়েছে। সরকার প্রথম দিকে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে পারেনি, তাই বাজারে একটা ভিন্ন সংকেত পৌঁছল: হয়তো দাম বাড়বে। সেই অস্থির বার্তায় মানুষ, ব্যবসায়ী ও পাম্প মালিকরা মজুত শুরু করলেন। প্যানিক বাইং আর মজুদদারি কৃত্রিম ঘাটতি সৃষ্টি করল।
দুষ্ট চক্রের প্রথম ধাপে বাস্তব সমস্যার সঙ্গে আচরণগত সংকট জুড়ে যায়। কৃত্রিম ঘাটতি দেখা মাত্রই ভয় বাড়ে, ভয়ের ফলে ক্রেতারা আরো বেশি কিনে ফেলে। ফলে ঘাটতি আরও গাঢ় হয়। দ্বিতীয় ধাপে যখন সরকার শেষ পর্যন্ত দাম বাড়ায়, মজুদকারীরা লাভবান হয়,সাধারণ মানুষকে বেশি দামেই কিনতে হয়। কিন্তু তেল কেবল একটি পণ্যের নাম নয়, এটি অর্থনীতির চালিকা শক্তি। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, বাসভাড়া বাড়ে, বাজারজাতকরণ খরচ বাড়ে;ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দর বৃদ্ধি পায় এবং পুরো সেবা খাতের উপর প্রভাব পড়ে। এক খাতের ধাক্কা ধীরে ধীরে অন্য খাতগুলোতেও বিস্তার পায়।
তৃতীয় ধাপে সরকার যদি ভর্তুকি দিয়ে চাপ সামলাতে চায়,তাহলে রাজস্ব সংকট ও সরকারি ঋণ বৃদ্ধির মুখে পড়তে হয়। বাজেট অবসান, মুদ্রাস্ফীতি বাড়া,টাকার স্রোতে পরিবর্তন-এসব মিলিয়ে সংকট নিজের ভেতরেই শক্তিশালী হয়। আর সবচেয় দুর্বল জায়গা হলো জনগণের সাথে সরকারের যোগাযোগ। তেলের জন্য লাইনে দাঁড়ানো মানুষ, লোডশেডিং ও প্রতিদিন বাড়তে থাকা দামের মধ্যে কাগজ-কলমে যেকোনো ব্যাখ্যা তাদের বোঝাতে অপ্রতুল। হঠাৎ পরিবর্তনের এই সময়টায়সরকারকে স্বচ্ছভাবে বলে দিতে হতো – তারা কী করছে,কেন করছে,কতদিন লাগতে পারে,এবং নাগরিকরা কীভাবে সহযোগিতা করবেন। কিন্তু তা হয়নি। বরং দেখা গেছে মানুষকেই দায়ী করতে, অনেক অযাচিত কথা বলতে।
দুষ্ট চক্র ভাঙার উপায় আছে,কিন্তু তার জন্য বাস্তবতা মেনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। প্রথমত,জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহের বিকল্প পথ দ্রুত খুঁজে বের করতে হবে। বিকল্প সরবরাহ চেইন, নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহার বাড়ানো,ও জরুরি রিজার্ভ লাইন শক্ত করতে হবে। বাজারকে গুজবের হাতে ছেড়ে দিলে সমস্যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। দ্বিতীয়ত,মজুদদারী ও কল্যাণবাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি ও কার্যকর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রয়োজন;শুধু ঘোষণায় থামলে হবে না, মাঠে বাস্তব নিয়ন্ত্রণ বাধ্যতামূলক। তৃতীয়ত, ভর্তুকি-নীতিতে টার্গেটিং অপরিহার্য-সবাইকে সমানভাবে ভর্তুকি দিলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হবে;বরং গণপরিবহণ, কৃষি ও নিম্নআয়ের পরিবারের মতো সংবেদনশীল সেক্টরকে লক্ষ্য করে সহায়তা দিতে হবে। চতুর্থত, বাজারে সরবরাহ সচল রাখতে প্রণোদনা ও লজিস্টিক সমাধান নিতে হবে যেন সাধারণ মানুষ আতঙ্কে অতিরিক্ত ক্রয় না করে।
সবচেয়ে বড় পাঠ হলো অনিশ্চয়তার ক্ষতিকর ভূমিকা। মানুষ যখন নিশ্চিত নয়, তখন তারা এমন সিদ্ধান্ত নেয় যা ব্যক্তিগত স্বস্তির জন্য গ্রহণযোগ্য হলেও সামাজিকভাবে সংকটকে আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই সমাধান কেবল মূল্য সমন্বয় বা ভর্তুকি নয়। সমাধান হলো দুষ্ট চক্রের শুরুতে গিয়ে সেটাকে ভাঙা, সঠিক তথ্য দেওয়া, নিয়ন্ত্রিত সরবরাহ,মজুতদারি রুখে দেওয়া এবং টার্গেটেড অর্থনৈতিক সহায়তা। না হলে তেলের সংকট দ্রুত বাজার ও মানুষের জীবনের সংকটে পরিণত হবে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের রাজনৈতিক আস্থা ও শাসনতান্ত্রিক স্থিতিশীলতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
এই জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় সরকারের সিদ্ধান্ত-শীলতা, বাস্তবতাকে মেনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ ও স্বচ্ছ যোগাযোগই নির্ধারণ করবে-সংকট কীভাবে গতি পাবে,এবং সেই গতি সরকারের ও দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর কী শেষ প্রভাব ফেলবে।
Comments