হামের আতঙ্কের মাঝে মোংলা হাসপাতালে ভিন্ন এক চিত্র
দশ মাস বয়সী ছোট্ট মাহিয়া তানহার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। কয়েক দিন ধরেই তীব্র জ্বর আর শরীরে লালচে দানায় ছটফট করছিল সে। দুশ্চিন্তায় দিশেহারা বাবা-মা তাকে মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে এলে তাদের চোখেমুখে ছিল শঙ্কার ছাপ।
কিন্তু হাসপাতালের বারান্দায় পা রাখতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। নার্সদের মমতা আর চিকিৎসকদের তড়িৎ সেবায় মুহূর্তেই ভরসা ফিরে পান তারা।
মাহিয়ার মতো গত ১১ দিনে অন্তত ৩৫ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে এখানে এসেছে। তবে আতঙ্কের কালো মেঘ সরিয়ে আশার আলো দেখাচ্ছে উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের নিবিড় সেবা।
সরেজমিনে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। চিকিৎসাধীন ৯ বছর বয়সী ফাহিমের মাথায় স্নেহভরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন দায়িত্বরত ডাক্তার। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফাহিমের বাবা মো. রিয়াজুল আবেগঘন কণ্ঠে বলেন,"ছেলের অবস্থা দেখে খুব ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু এখানে আসার পর ডাক্তাররা যেভাবে আপন করে নিয়েছেন, তাতে অর্ধেক অসুখ ভয়েই কেটে গেছে। প্রয়োজনীয় সব ওষুধও বিনামূল্যে পাচ্ছি—এটা আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য বড় পাওয়া।"
গত ৩১ মার্চ শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত ১১ জন শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৭ জন শিশুর অবস্থাও উন্নতির দিকে।
মনপুরার মাহিয়া তানহা, চিলা ধারার ফারহানা হালিম কিংবা কুমারখালীর আব্দুল্লাহ—প্রত্যেক রোগীর খোঁজ নিচ্ছেন চিকিৎসকরা নিবিড়ভাবে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ২ জন ভর্তি হলেও হাসপাতালের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনায় পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শাহিন জানান, প্রাদুর্ভাবের শুরুতেই একটি বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত ওষুধ মজুদ রয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ইপিআই টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করছেন।
একসময় সরকারি হাসপাতাল নিয়ে মানুষের মনে যে দ্বিধা ছিল, মোংলার বর্তমান চিত্র তা বদলে দিয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন সেবা ও ওষুধের সহজলভ্যতা মানুষের আস্থা ফিরিয়ে এনেছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তৎপরতায় পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বস্তিদায়ক। সংক্রমণের হার থাকলেও সচেতনতা ও সেবার দৃঢ়তায় তা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে।
দিনশেষে ফাহিম কিংবা মাহিয়ার নির্মল হাসিই যেন চিকিৎসকদের ক্লান্ত পরিশ্রমে তৃপ্তির পরশ বুলিয়ে দেয়।
Comments