গভীর রাতে সুন্দরবনের খড়কুড়িয়া খালের শান্ত জলে তখন জোয়ারের টান। হঠাতই বনের নিস্তব্ধতা চিরে জ্বলে উঠল কোস্ট গার্ডের শক্তিশালী সার্চলাইটের আলো। তা দেখে বাঘের ডেরায় খোদ দস্যুদেরই তখন 'পিলে চমকানো' অবস্থা। পালানোর পথ খুঁজতে গিয়ে জিম্মি জেলে মজিবর গাজীর (৫০) ওপর যে নিষ্ঠুরতা দস্যুরা দেখাল, তা কোনো হরর সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানায়।
হাত-পা কষে নৌকায় বেঁধে রেখে যাওয়ার সময় দস্যু সরদার মজিবরের কানে কানে বলে গেল সেই যমদূতের মতো হাড়হিম করা কথা— "কপাল ভালো থাকলে বাঁচবি, আর খারাপ থাকলে কুমিরের পেটে যাবি!"মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) দুপুরে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই নাটকীয় উদ্ধার অভিযানের কথা জানান।
উদ্ধার হওয়ার পর মজিবর গাজীর চোখে-মুখে তখনো মৃত্যুর আতঙ্ক। কোস্ট গার্ডের কাছে তিনি শোনালেন সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা। মজিবর বলেন:" ওরা যখন দেখল কোস্ট গার্ডের নৌকার শব্দ আর টর্চের আলো চলে এসেছে, তখন ওদের মধ্যে হুলস্থুল পড়ে যায়। আমাকে নিয়ে বনের ভেতর ঢোকার সময় না পেয়ে ওরা আমাকে নৌকায় ফেলে দেয়। হাত-পা বাঁধার সময় এক ডাকাত বলল— তোকে কুমিরের জন্য রেখে গেলাম। যদি কপালে থাকে উদ্ধার হবি, নাইলে কুমিরের ভোজ হবি!"মজিবর আরও জানান, ওই এলাকাটি কুমিরের অভয়াশ্রম হিসেবে পরিচিত। দস্যুরা তাকে এমন জায়গায় নৌকায় বেঁধে ফেলে গিয়েছিল যেখানে সামান্য নড়চড় করলেই নৌকা উল্টে কুমিরের মুখে পড়ার ভয় ছিল।
সোমবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে খুলনার কয়রা থানাধীন খড়কুড়িয়া খালে হানা দেয় কোস্ট গার্ড স্টেশন কয়রার একটি বিশেষ দল। অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তা লেঃ খালিদ সাইফুল্লাহ জানান, কোনো গুলি বিনিময়ের প্রয়োজন পড়েনি। বনের অন্ধকারে কোস্ট গার্ডের দাপুটে উপস্থিতি এবং সার্চলাইটের তীব্র আলো টের পেয়েই 'জোনাব বাহিনী'র দস্যুরা জিম্মিকে ফেলে বনের গহিনে গা ঢাকা দেয়।
কয়রা থানার বাসিন্দা মজিবর গাজী এখন নিজের ঘরে ফেরার অপেক্ষায়। কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত করতে তাদের এই 'জিরো টলারেন্স' নীতি অব্যাহত থাকবে। তবে দস্যুদের এমন পৈশাচিক ব্যবহার বনের জেলেদের মনে নতুন করে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
Comments