বাংলাদেশের জ্বালানি ঝুঁকি বেড়েছে: সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থা
বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান জ্বালানি-সংক্রান্ত ঝুঁকির মুখে পড়ছে এবং নীতিগতভাবে তা মোকাবিলার সক্ষমতা সীমিত হয়ে আসছে। এমনটা জানিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংস, বলেছে, বৈশ্বিক সরবরাহ বিঘ্ন হওয়ায় এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ,পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা-এই দেশগুলো কিছুটা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখালেও,আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এবং দুর্বল বৈদেশিক অবস্থানের কারণে তারা "উচ্চ ঝুঁকিতে" রয়েছে।
এসঅ্যান্ডপি জানায়, "এই দেশগুলো তেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরবরাহ বিঘ্নের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।" যদি জ্বালানির দাম প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় ধরে বাড়তি থাকে,তাহলে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি,মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক খাত আরও চাপে পড়বে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী,যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় এবং জ্বালানির সরবরাহ কতটা বজায় থাকে-এসব বিষয় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উচ্চ জ্বালানি মূল্য আগামী ৩ থেকে ৬ মাসে মূল্যস্ফীতি কমার গতি থামিয়ে দিতে পারে এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে দুর্বল করতে পারে। বাংলাদেশের প্রায় ৫০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন গ্যাসনির্ভর,যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ আমদানি করা হয়। অন্যদিকে,অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের ক্ষেত্রে দেশটি প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর।
দেশে জ্বালানির মজুদ এক মাসেরও কম সময়ের জন্য যথেষ্ট থাকতে পারে। এরপর আমদানি ব্যাহত হলে জ্বালানি ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করতে হতে পারে। সরকার ও রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি সংস্থাগুলো সম্প্রতি অতিরিক্ত গ্যাস,ডিজেল ও পেট্রোল সংগ্রহ করলেও সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে,যেমন-খুচরা জ্বালানির দামে সীমা নির্ধারণ,সাময়িক রেশনিং ব্যবস্থা চালু,সার কারখানার উৎপাদন কমিয়ে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ অগ্রাধিকার দেওয়া এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে আগেভাগে স্কুল বন্ধ রাখা।
এর মধ্যেই দেশে মূল্যস্ফীতি উচ্চ অবস্থানে রয়েছে,ফেব্রুয়ারিতে যা ৯.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে,যা জানুয়ারিতে ছিল ৮.৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও পেছনে হাঁটছে।
প্রতিবেদন বলছে,এই যুদ্ধ বাংলাদেশের উন্নতিশীল বৈদেশিক অবস্থার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা বেড়েছে এবং চলতি হিসাবেও সামান্য উদ্বৃত্ত রয়েছে,যা তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তবে রেমিট্যান্স কমে গেলে তা বৈদেশিক লেনদেন ও অভ্যন্তরীণ ভোগ উভয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ অবস্থায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার আরও বিলম্বিত হলে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির হার কমে যেতে পারে বা বৈদেশিক ঋণের চাপ বেড়ে যেতে পারে।
এসঅ্যান্ডপি আরও জানায়,পাকিস্তান,শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ কিছুটা পুনরুদ্ধারের পথে থাকলেও,দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ জ্বালানি মূল্য ও বাণিজ্য ও রেমিট্যান্সে বিঘ্ন তাদের অর্থনীতিকে আবার দুর্বল করে দিতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো,সরকারি রাজস্ব জিডিপির মাত্র ৯ শতাংশ। ফলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে আর্থিকভাবে বেশি সুযোগ নেই। তুলনামূলকভাবে লাওস কম ঝুঁকিতে রয়েছে,কারণ তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন মূলত জলবিদ্যুৎ নির্ভর এবং আর্থিক অবস্থাও তুলনামূলক স্থিতিশীল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী,মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এসব দেশের মুদ্রা ও মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ বাড়বে এবং ক্রেডিট সূচক খারাপ হতে পারে। তবে রেটিংয়ের ওপর প্রভাব সীমিত থাকতে পারে,কারণ আগেই এসব ঝুঁকি অনেকটা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্রেডিট রেটিং "বি +",যার স্বল্পমেয়াদি পূর্বাভাস স্থিতিশীল।
এই রেটিং বলছে যে, দেশের মাথাপিছু আয় কম এবং রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতা ও সুদের উচ্চ বোঝার কারণে আর্থিক নমনীয়তাও কম। সবশেষে এসঅ্যান্ডপি জানায়,স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক ধাক্কা বাংলাদেশের পক্ষে সামাল দেওয়া জটিল হবে।
Comments