‘ডিপ স্টেট’ বিতর্ক: ক্ষমতার আড়ালের ছায়া, নাকি রাজনৈতিক বয়ানের নতুন অস্ত্র
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনায় হঠাৎ করেই কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে একটি বহুল আলোচিত কিন্তু অস্পষ্ট ধারণা-'ডিপ স্টেট'। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার বক্তব্য এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের মন্তব্য এই শব্দটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। তবে এই আলোচনার ভেতরে যতটা তথ্য আছে, তার চেয়ে বেশি আছে ব্যাখ্যা, সন্দেহ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান।
আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুতেই কোনো এক 'ডিপ স্টেট' শক্তি তাদের কাছে প্রস্তাব দিয়েছিল, নির্দিষ্ট কিছু স্বার্থ রক্ষা করা হলে সরকারকে দীর্ঘ সময়, এমনকি ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তার ভাষ্যমতে, এই প্রস্তাবের সঙ্গে একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপও যুক্ত ছিল, যেখানে বিচারিক প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করা, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্বাচনের বাইরে রাখা এবং ক্ষমতার কাঠামো নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে গুরুতর। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন, এই 'ডিপ স্টেট' কারা? আসিফ মাহমুদ নিজে তা স্পষ্ট করেননি। ফলে তার বক্তব্য একদিকে যেমন কৌতূহল তৈরি করছে, অন্যদিকে তেমনি তা নানা ধরনের ব্যাখ্যার সুযোগও করে দিচ্ছে।
অন্যদিকে, নাহিদ ইসলাম রাজশাহীর এক অনুষ্ঠানে দাবি করেছেন, শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পেছনেও 'ডিপ স্টেট' জড়িত। অর্থাৎ, 'ডিপ স্টেট'কে এখানে শুধু রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণকারী নয়, বরং সরাসরি ঘটনাপ্রবাহের নিয়ন্ত্রক হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এতে করে এই ধারণাটি আরও রহস্যময় ও বিস্তৃত রূপ পাচ্ছে।
বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটে 'ডিপ স্টেট' বলতে সাধারণত বোঝানো হয় এমন এক অদৃশ্য ক্ষমতাকাঠামো, যা নির্বাচিত সরকারের বাইরে থেকেও রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করে। এতে থাকতে পারে সামরিক-বেসামরিক আমলা, গোয়েন্দা সংস্থা, কর্পোরেট শক্তি, এমনকি বিদেশি রাষ্ট্রের প্রভাব। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ধারণাটি প্রায়ই প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণের বদলে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে বেশি ব্যবহৃত হয়।
বর্তমান আলোচনায় একটি প্রবণতা স্পষ্ট যে,'ডিপ স্টেট'কে বিদেশি শক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা। পাশাপাশি দেশীয় এনজিও, মিডিয়ার কিছু অংশ, অবসরপ্রাপ্ত কিছু সামরিক বেসামরিক আমলা এবং বিভিন্ন মতাদর্শিক গোষ্ঠীকেও এই কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। কিন্তু এসব দাবি কতটা তথ্যনির্ভর,আর কতটা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা,সেটি যাচাই করা জরুরি।
২০২৪ এর ছাত্র আন্দোলনের প্রসঙ্গেও একই ধরনের ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে, যেখানে বলা হচ্ছে, আন্দোলনকে পরিকল্পিতভাবে 'ছাত্র-জনতার আন্দোলন' হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল, যাতে কোনো রাজনৈতিক দল সরাসরি নেতৃত্বে না থাকে। এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক ও দেশীয় শক্তি আন্দোলনের কাঠামো তৈরি করেছিল এবং পরবর্তীতে একটি 'নিয়ন্ত্রিত' সরকার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা ছিল।
তবে এই বয়ানের ভেতরে একটি বড় প্রশ্ন রয়ে যায়-ছাত্র আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ততা, জনসম্পৃক্ততা এবং বাস্তব সামাজিক-রাজনৈতিক অসন্তোষের জায়গা কোথায়? সবকিছু যদি পূর্বপরিকল্পিত হয়,তাহলে সাধারণ মানুষের ভূমিকা ও বাস্তব অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করা হয় না কি?
এছাড়া জামায়াত, বিএনপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা নিয়েও যে বিশ্লেষণ তুলে ধরা হচ্ছে, তা মূলত একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি। এখানে বলা হচ্ছে, আন্দোলনের পর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব তৈরি হয় এবং বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চেষ্টা করে। কিন্তু এসব দাবির পক্ষে সুস্পষ্ট, নিরপেক্ষ প্রমাণ খুব কমই সামনে এসেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-এই ধরনের 'ডিপ স্টেট' বয়ান রাজনৈতিকভাবে কী ভূমিকা রাখে। অনেক সময় দেখা যায়, যখন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া জটিল হয়ে ওঠে বা প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না, তখন অদৃশ্য কোনো শক্তিকে দায়ী করা সহজ হয়ে যায়। এতে করে একদিকে নিজের অবস্থানকে বৈধতা দেওয়া যায়, অন্যদিকে প্রতিপক্ষকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়।
ড. ইউনুসকে ঘিরে যে আলোচনা এসেছে-তিনি নাকি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন বা তাকে সেইভাবে দেখতে চাওয়া হয়েছিল-এই বিষয়টিও একইভাবে ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল। তার কিছু বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এমন ধারণা তৈরি করা হয়েছিল। এমনকি তার কিছু উপদেষ্টা, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা প্রায়ই বলতেন যে জনগণ চায় তারা পাঁচ বছর থাকেন।
সবশেষে বলা যায়, 'ডিপ স্টেট' নিয়ে বর্তমান বিতর্ক বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গভীর সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে এবং তা হলো অবিশ্বাস এবং অস্বচ্ছতা। যখন প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা কমে যায়, তখন এমন ধারণা সহজেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-প্রমাণভিত্তিক আলোচনা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা। 'ডিপ স্টেট' আছে কি নেই, এই প্রশ্নের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, এই ধারণা ব্যবহার করে রাজনৈতিকভাবে কে কী অর্জন করতে চাইছে।
অতএব, এখন প্রয়োজন আবেগ বা অনুমানের বাইরে গিয়ে তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ। কারণ, ছায়ার সঙ্গে লড়াই করে বাস্তব সমস্যার সমাধান করা যায় না; বরং তাতে বিভ্রান্তি আরও বাড়ে।
Comments