আমরা যেন একাত্তরের দেখানো পথেই চলি
আজ আমাদের জাতির স্বাধীনতার ৫৫তম বার্ষিকী। এই দিনটি এলেই আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি সেইসব বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি স্বাধীন দেশ। একই সঙ্গে আমরা স্মরণ করি অসংখ্য সাধারণ মানুষকে, যারা নিজেদের জীবন, স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে বিসর্জন দিয়ে এই দেশকে জন্ম দিয়েছেন।
এই দিনটির তাৎপর্য আরও বিশেষ, কারণ এটি এসেছে ২০-২৪ এ এক ঐতিহাসিক ঘটনার পর, ছাত্রনেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের মাধ্যমে একনায়কতান্ত্রিক শাসনের পতন ঘটিয়ে। এরপর এ বছর ১২ ফেব্রুয়ারি একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধমে গঠিত হয়েছে নতুন সরকার।
এই দুটি ঘটনা, একটি ১৯৭১ সালে সংঘটিত মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং অন্য ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আন্দোলন, যার মাধ্যমে জনগণ তাদের মৌলিক অধিকার ও রাজনৈতিক পরিসর পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে যে স্বৈরাচারী প্রবণতা গড়ে উঠেছিল, তার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ ও সাধারণ মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানায়। এই আন্দোলন নিঃসন্দেহে আমাদের গণতান্ত্রিক চেতনার একটি শক্তিশালী প্রকাশ।টি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান, সময়ের ব্যবধানে আলাদা হলেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য বহন করে। উভয় ক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি অন্যায়, নিপীড়ন ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে মানুষের অদম্য প্রতিরোধ। এটি প্রমাণ করে যে বাঙালি জাতি কখনো অন্যায়ের কাছে মাথা নত করে না। তবে সাম্প্রতিক সময়ে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, কিছু মহল এই দুটি ঘটনাকে সমমর্যাদায় দেখানোর চেষ্টা করছে, যা ইতিহাসের প্রতি অবিচার। কোন কোন মহল একাত্তরকে অস্বীকার করারও চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ আমাদের জাতির ইতিহাসে একক ও অনন্য একটি অধ্যায়। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না; এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা যুদ্ধ, যেখানে একটি জাতি দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নয় মাসব্যাপী এই যুদ্ধ ছিল চরম ত্যাগ ও সংগ্রামের এক অনন্য উদাহরণ। ৩০ লক্ষ লক্ষ শহীদ হয়েছেন, আড়াই লক্ষ নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কোটি মানুষ শরণার্থী হয়েছেন। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ আমরা অর্জন করি আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।
অন্যদিকে,
তবে এই দুটি ঘটনাকে একই কাতারে ফেলা মোটেও যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম, যেখানে স্বাধীনতা অর্জনই ছিল প্রধান লক্ষ্য। এটি ছিল বহিরাগত শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের আন্দোলন ছিল একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের প্রচেষ্টা। এই মৌলিক পার্থক্যগুলো উপেক্ষা করে যদি আমরা এই দুটি ঘটনাকে সমানভাবে মূল্যায়ন করি, তবে আমরা মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বকে খাটো করার ঝুঁকি তৈরি করি।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করা মানে আমাদের জাতীয় পরিচয়কেই প্রশ্নবিদ্ধ করা। আমাদের মনে রাখতে হবে, মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; এটি আমাদের জাতীয় সত্তার ভিত্তি। এটি আমাদের গর্ব, আমাদের প্রেরণা, আমাদের চেতনার মূল উৎস। তাই এটিকে কখনোই সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহার বা অপব্যাখ্যা করা উচিত নয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ২০২৪ সালের আন্দোলনের গুরুত্ব নেই। বরং এই আন্দোলন আমাদের সামনে একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা অর্জনের পরও গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখতে হয়। এখন আমাদের দায়িত্ব হলো এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা।
১৯৭১ সালে আমরা যে স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, তা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। দারিদ্র্য, বৈষম্য, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা এখনো আমাদের অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাই আজকের এই দিনে আমাদের প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত, আমরা যেন একাত্তরের চেতনাকে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যাই।
বর্তমান নির্বাচিত সরকার যেভাবে সবাইকে নিয়ে পথ চলছে, তা অবশ্যই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে শুধু সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে চলবে না। দেশের প্রতিটি নাগরিককেই এই পরিবর্তনের অংশীদার হতে হবে। আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ চর্চা করতে হবে।
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। ২০২৪ সালের আন্দোলন আমাদের দেখিয়েছে যে সেই চেতনা এখনো জীবিত। এখন সময় এসেছে এই দুই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি উন্নত, ন্যায়ভিত্তিক ও সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার।
তাই প্রতিজ্ঞা হোক মুক্তিযুদ্ধের মহিমাকে অক্ষুণ্ণ রেখে, তার চেতনাকে ধারণ করে, দেশ এগিয়ে যাবে একটি সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে। বাংলাদেশ যেন একাত্তরের দেখানো পথেই চলে সবসময়।
Comments