বিকল্প বাজার থেকে ডিজেল ও এলএনজি আমদানি করছে বাংলাদেশ
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সম্ভাব্য জ্বালানি ও গ্যাস সংকট এড়াতে বাংলাদেশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকার বিকল্প বাজার থেকে জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা করে মার্চ মাসজুড়ে জাতীয় চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করেছে। কর্মকর্তারা জানান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন উৎস থেকে ২ লাখ ৮০ হাজার টন পরিশোধিত ডিজেল আমদানির চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা এই মাসের বাকি সময়ের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করবে।
সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সিঙ্গাপুর থেকে দুটি এলএনজি (LNG) চালানও নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, কাতার থেকে একটি এলএনজি জাহাজ বর্তমানে বাংলাদেশের পথে রয়েছে, যা গ্যাস সংকটের আশঙ্কা কমাবে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে উদ্বেগ
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। বিশেষ করে স্ট্রেইট অব হরমুজ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আমদানিকৃত অপরিশোধিত তেলের বড় অংশ এই পথেই আসে।
তবে ইরান স্পষ্ট করেছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জাহাজ ছাড়া অন্য দেশের জাহাজ চলাচলে বাধা দেবে না। ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত থাকবে।
'আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই'
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের বলেন,"আগামী ৯ মার্চ আরও দুটি তেলবাহী জাহাজ বাংলাদেশে পৌঁছাবে। আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।"তিনি সাধারণ মানুষকে অযথা পেট্রোল পাম্পে ভিড় না করার আহ্বান জানান।
ডিজেলের মজুত ও আমদানি
৪ মার্চ পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ টন ডিজেল মজুত ছিল, যা প্রায় ৯ দিনের চাহিদা পূরণে সক্ষম। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী বলেন,
বাংলাদেশের মাসিক ডিজেল চাহিদা ৩ লাখ ৮০ হাজার টন। তিনি জানান, ২ লাখ ৮০ হাজার টন ডিজেল আমদানির ব্যবস্থা করা হয়েছে, এর বড় অংশ মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আসছে,কিছু জাহাজ ইতোমধ্যে পথে রয়েছে, বাকিগুলো লোডিং চলছে,ভারত থেকেও প্রতি মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার ডিজেল আমদানির চুক্তি রয়েছে। তবে পার্বতীপুর ডিপোর সংরক্ষণ ক্ষমতা মাত্র ৫ হাজার টন, তাই আপাতত ভারত থেকে বেশি আমদানি বাড়ানো সম্ভব নয়।
পাম্পে সীমিত সরবরাহ
ঢাকার পরিবহন মালিকরা জানিয়েছেন, চাহিদা বাড়ায় অনেক পেট্রোল পাম্প সীমিত পরিমাণে ডিজেল দিচ্ছে। দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক চালকরা বলছেন, প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় কিছু ট্রিপ কমাতে হচ্ছে। তবে মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, "কেউ অতিরিক্ত ডিজেল কিনে মজুত না করলে পাম্পে সংকটের কোনো কারণ নেই।"
অন্যান্য জ্বালানির মজুত
৪ মার্চ পর্যন্ত দেশে জ্বালানির মজুত পরিস্থিতি:
• অকটেন: ২৮,১৫২ টন (প্রায় ১৫ দিনের জন্য যথেষ্ট)
• পেট্রোল: ১৭,৩৬৪ টন (প্রায় ৮ দিনের জন্য যথেষ্ট)
এছাড়া চলতি মাসে আরও প্রায় ৪০ হাজার টন পেট্রোল ও অকটেন দেশে আসবে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে সমস্যা নেই
ফার্নেস অয়েলের মজুত রয়েছে ৬৬,১৯২ টন, যা প্রায় ৫৯ দিন বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাহিদা পূরণ করতে পারবে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় কোনো সমস্যা হওয়ার আশঙ্কা নেই।
জেট ফুয়েলের পরিস্থিতি
৪ মার্চ পর্যন্ত দেশে ৪১,০৮৪ টন জেট ফুয়েল মজুত ছিল, যা ৩৬ দিনের জন্য যথেষ্ট। এছাড়া ২২-২৫ মার্চের মধ্যে আরও ২০ হাজার টন জেট ফুয়েল আসবে। মধ্যপ্রাচ্যে ফ্লাইট কমে যাওয়ায় জেট ফুয়েলের চাহিদাও কমেছে। ফলে এখনই কোনো সংকটের আশঙ্কা নেই। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের জিএম (পিআর) কামরুল ইসলাম বলেন, "এখনও যুদ্ধের প্রভাব জেট ফুয়েলে পড়েনি। তবে যুদ্ধ দীর্ঘ হলে সংকট বা দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।"
গ্যাস পরিস্থিতি
বাংলাদেশ কাতার ও ওমান থেকে সরকার-টু-সরকার চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি আমদানি করে।সম্ভাব্য গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকার একটি সার কারখানা ছাড়া বাকি সব কারখানায় আপাতত গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রেখেছে। তবে এখন পর্যন্ত বাসাবাড়ি, শিল্প বা সিএনজি স্টেশনে বড় ধরনের গ্যাস সংকটের খবর পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রাম বন্দরে আসছে একাধিক জাহাজ
চট্টগ্রাম বন্দরের দিকে বর্তমানে ৪টি এলএনজি জাহাজ ও ২টি এলপিজি জাহাজ আসছে।
• ৪টি এলএনজি জাহাজে মোট প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টন এলএনজি
• ২টি এলপিজি জাহাজে প্রায় ৩৫ হাজার টন এলপিজি
এর মধ্যে ২টি এলএনজি জাহাজ ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে পৌঁছেছে এবং বাকি দুটি আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পৌঁছাবে। ওমানের সোহর বন্দর থেকে আসা দুটি এলপিজি জাহাজ মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির জন্য প্রায় ৩৫ হাজার টন এলপিজি নিয়ে আসছে।
Comments