আওয়ামী লীগের ফেরা, না ফেরা
অনেকেই প্রশ্ন করে আওয়ামী লীগ ফিরবে কবে? বা আদৌ কি ফিরতে পারবে? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। কারণ সেভাবে আমার কাছে কোন তথ্য নেই। তবে বিশ্লেষণ তো করা যেতেই পারে একজন নাগরিক হিসেবে।
এ মুহূর্তে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর তার কার্যালয় পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২-এর বাড়ি গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। সারাদেশে আওয়ামী লীগের অফিসগুলো আক্রমণের শিকার হয়েছে। লাখ লাখ কর্মী আয় রোজগারহীনভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। মামলা হামলায় বিপর্যস্ত। অনেকে খুনের শিকার হয়েছেন।
শেখ হাসিনা দিল্লিতে আছেন ভারত সরকারের ব্যবস্থাপনায়। তবে দল এবং অঙ্গ সংগঠন সমূহের কেন্দ্রীয় নেতারা প্রায় সবাই সহি সালামতে বিদেশে আছেন।
এ অবস্থায় দলের কার্যক্রম নতুন করে শুরু করা নির্ভর করছে দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় বসা বিএনপির ওপর, যে দলটিকে ক্ষমতার পুরো সময়টিতেই দৌড়ের ওপর রেখেছিল আওয়ামী লীগ। দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে জেলেও পুরেছিল শেখ হাসিনা সরকার।
তাই জামাত-এনসিপি জিততে পারেনি বলে, পুরো পরিস্থিতিই আওয়ামী লীগের অনুকূলে চলে গেছে তা বলা যাবেনা।
দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে প্রায় পুরোটার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ। এ কথা শুধু দল বিরোধীরাই বলছে না, বরং খোদ আওয়ামী লীগের ভিতরেই এমন কথা বহু প্রচলিত। আওয়ামী লীগের কর্মী সাধারণ মনে করে এসব নেতার বেশিরভাগ শুধু দুর্নীতিবাজ নয়, বরং এরা অযোগ্য এবং এরা কর্মীদের শুধু কর্মচারী মনে করত, আর নিজেদের মালিক ভাবতো দলের।
এমন এক অবস্থায় দল তাহলে রাজনীতিটা করবে কী করে? আসলে আওয়ামী লীগ তো রাজনীতিই করেনি তার শাসনামলটায়, করেছে ক্ষমতা চর্চা। তাই ক্ষমতা থেকে ছিটকে পড়ার পর আর দলকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। ক্ষমতায় বিলীন হয়েছিল আওয়ামী লীগ, আর শেখ হাসিনা দেশ চালিয়েছিলেন আমলা, পুলিশ আর গোয়েন্দাদের দিয়ে। দল ব্যস্ত ছিল গৃহ বিবাদে।
তো সেই দলের ফেরা তো এক বিরাট চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। কারণ সুযোগ নিজেরাই শেষ করে গেছে। ইতিহাস বলছে, বড়ো রাজনৈতিক দলগুলো সংকটের সময়ে সাধারণত তিনটি পথ বিবেচনা করে
নেতৃত্বে পরিবর্তন বা পুনর্গঠন
দলের শীর্ষ পর্যায়ে নতুন মুখ বা ভিন্নধর্মী নেতৃত্ব আনা হলে জনমনে নতুন বার্তা যায়- "দল পরিবর্তনের পথে।" এতে সংগঠন পুনরুজ্জীবিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
নীতিগত ও সাংগঠনিক সংস্কার
কখনও ব্যক্তি নয় বরং দলীয় নীতি,কার্যপ্রণালি, দুর্নীতি ইস্যু, তৃণমূল সংগঠন-এসব জায়গায় বড়ো ধরনের সংস্কার এনে দল ঘুরে দাঁড়ায়।
কৌশলগত পুনর্বিন্যাস
রাজনীতিতে সমমানসিকতার ব্যক্তি ও দলের সাথে যোগাযোগ, নতুন সামাজিক গোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ, তরুণ নেতৃত্বের অংশগ্রহণ-এসবও বড়ো ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন হলো কোন কাজটা আওয়ামী লীগ আগে করবে?
নেতৃত্ব না বদলালে-বিশেষ করে বড়ো সংকট, চাপ বা জন-আস্থার ঘাটতির সময়-একটি বড়ো দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কয়েক ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে -
জন আস্থা আরও ক্ষয়
যদি জনগণের একাংশ নেতৃত্বকেই সমস্যার উৎস মনে করে, তাহলে একই নেতৃত্ব থাকলে "পরিবর্তন"এর বার্তা যায় না। এতে নিরপেক্ষ বা দোদুল্যমান সমর্থকরা দূরে সরে যেতে পারেন।
তৃণমূলের মনোবল কমে যাওয়া
দলের কর্মী-সমর্থকেরা যদি মনে করেন শীর্ষ পর্যায়ে আত্মসমালোচনা বা সংস্কারের ইচ্ছা নেই, তাহলে মাঠপর্যায়ে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
অভ্যন্তরীণ বিভক্তি
নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ থাকলে ভেতরে ভেতরে গ্রুপিং, ভাঙন বা বিকল্প শক্তি তৈরির প্রবণতা বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক চাপ
একই নেতৃত্ব থাকলে আন্তর্জাতিক মহলে ইমেজ সংকট দীর্ঘায়িত হতে পারে।
ঝুঁকিটা বেশি জন-আস্থার, নাকি অভ্যন্তরীণ সংগঠনের?
জনআস্থা ও অভ্যন্তরীণ সংগঠন, দুটোই একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মতো বড়ো দলে এই দুই ঝুঁকি একসাথে তৈরি হলে প্রভাবটা বহুমাত্রিক হতে পারে।
জন-আস্থার ঝুঁকি বেশি হলে কী হয়?
• মধ্যপন্থি ভোটার সরে যায় :কোর সমর্থক থাকে, কিন্তু নিরপেক্ষ বা নতুন সমর্থক আর আকৃষ্ট হয় না।
• বিরোধীদের ন্যারেটিভ শক্ত হয় : "পরিবর্তন দরকার" স্লোগান সহজে জনপ্রিয় হয়।
• সামাজিক মাধ্যমে ইমেজ ক্ষয় : তরুণদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা দ্রুত ছড়ায়।
• দীর্ঘমেয়াদি ব্র্যান্ড ক্ষতি : ঐতিহাসিক অর্জন থাকলেও বর্তমান ইস্যু ঢেকে দেয়।
অভ্যন্তরীণ সংগঠনের ঝুঁকি বেশি হলে কী হয়?
• তৃণমূল নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে : মাঠে কর্মসূচি, প্রচার, ভোট ম্যানেজমেন্ট দুর্বল হয়।
• গ্রুপিং ও কোন্দল বাড়ে : কেন্দ্র–তৃণমূল দূরত্ব তৈরি হয়।
• যোগ্য নেতৃত্ব উঠে আসতে পারে না : তরুণ বা বিকল্প নেতৃত্ব সুযোগ পায় না।
• দুর্নীতি বা স্থানীয় অসন্তোষ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়।
দুটো একসাথে হলে?
এটা সবচেয়ে বড়ো সংকেত। ভেতরে শক্তি কমে গেলে বাইরে সমর্থন টেকসই থাকে না। আর বাইরে জনসমর্থন কমলে ভেতরের নেতাকর্মীরাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ফলে এক ধরনের চক্রাকার দুর্বলতা তৈরি হয়।
সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দল তাই তৃণমূল সংগঠন শক্তিশালী করা, অভ্যন্তরীণ বিভক্তি কমিয়ে ঐক্য জোরদার করা এবং তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনার কাজটা করতে পারে।
Comments