‘সিরিয়া-ইরাক-লিবিয়া হওয়া’ বাঁচল বাংলাদেশ?
২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে একটি প্রতীকী বাঁকবদল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। দিনটি কেবল একটি সিদ্ধান্তের দিন নয়; বরং রাষ্ট্র কোন পথে এগোতে চায়, তার একটি ইঙ্গিতবাহী মুহূর্ত। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা যেমন- সিরিয়া, ইরাক ও লিবিয়া-যেখানে দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরুকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক ভাঙন ও বহিরাগত হস্তক্ষেপ রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীলতার গহ্বরে ঠেলে দিয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে উগ্র-দক্ষিণপন্থার উত্থান, যা গণতন্ত্রের ভারসাম্য ও সংখ্যালঘু অধিকারের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে। এই দুই প্রান্তিকতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যদি মধ্যপন্থাকে বেছে নিয়ে থাকে, তবে সেটি নিঃসন্দেহে কৌশলগত দূরদর্শিতার পরিচয়।
'সিরিয়া-ইরাক-লিবিয়া হওয়া' এখন আর নিছক অলংকার নয়; এটি একটি বাস্তব সতর্কবার্তা। রাষ্ট্রযন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়লে, রাজনৈতিক আস্থা ক্ষয়ে গেলে এবং সশস্ত্র বা চরমপন্থী গোষ্ঠী প্রভাবশালী হয়ে উঠলে কী ঘটতে পারে, তার উদাহরণ এসব দেশ। ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা বিবেচনায় বাংলাদেশ এমন ঝুঁকি বহন করতে পারে না।
বহুমাত্রিক উন্নয়নযাত্রা-অবকাঠামো, রপ্তানি, মানবসম্পদ- সবকিছুই স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে সংঘাত এড়িয়ে সংলাপ ও সমঝোতার পথে থাকা কেবল রাজনৈতিক সৌজন্য নয়; এটি অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রয়োজন।
তবে মধ্যপন্থা মানেই নিষ্ক্রিয় আপস নয়। এটি নীতিগত ভারসাম্য-সংবিধান, আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার ও রাজনৈতিক বহুত্ববাদের প্রতি প্রতিশ্রুতি। বিশ্ব রাজনীতিতে উগ্র জাতীয়তাবাদ, পরিচয়ভিত্তিক বিভাজন ও কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বের প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে। এই প্রবণতা শুধু পশ্চিমা গণতন্ত্রে সীমাবদ্ধ নয়; এর অভিঘাত বৈশ্বিক। বাংলাদেশের মতো বহুত্ববাদী সমাজে এই ঢেউ অনুকরণ করা হলে সামাজিক সংহতি দুর্বল হতে পারে। মধ্যপন্থা তাই সামাজিক শান্তি ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার একটি সক্রিয় রক্ষাকবচ।
কিন্তু কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই স্থায়ী নিশ্চয়তা দেয় না। ১২ ফেব্রুয়ারির বার্তা যদি মধ্যপন্থার পক্ষে হয়ে থাকে, তবে ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকেই তার পরীক্ষা শুরু। অভ্যন্তরীণভাবে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, কর্মসংস্থানের চাপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-নির্ভর মেরুকরণ রাজনীতিকে দ্রুত চরমতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতা ক্ষোভ তৈরি করতে পারে, যা সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির অভাবে অগোছালো প্রতিবাদে রূপ নিতে পারে। বহির্বিশ্বেও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন, আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বৈশ্বিক শক্তির কৌশলগত স্বার্থ বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। এই বাস্তবতায় মধ্যপন্থা রক্ষা একদিনের কাজ নয়; এটি প্রতিদিনের অনুশীলন।
এখানেই প্রশ্ন আসে রাজনৈতিক কাঠামোর ভারসাম্য নিয়ে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী সামাজিক-গণতান্ত্রিক ধারার অনুপস্থিতি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। সামাজিক-গণতন্ত্র বাজার অর্থনীতির গতিশীলতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে চায়। কল্যাণরাষ্ট্র, শ্রমিক অধিকার, প্রগতিশীল করব্যবস্থা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা-এসব এর অগ্রাধিকার। এই ধারার একটি বিশ্বাসযোগ্য, সংগঠিত শক্তি না থাকলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সহজেই দুই প্রান্তে সরে যেতে পারে। একদিকে আছে অতি-রক্ষণশীল বা জাতীয়তাবাদী অবস্থান, অন্যদিকে থাকছে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যানমূলক প্রতিবাদী রাজনীতি।
একটি সুসংগঠিত সামাজিক-গণতান্ত্রিক শক্তি মধ্যপন্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে। এটি কেবল নির্বাচনী সমীকরণ নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি নীতি-উদ্যোগ ও গবেষণাভিত্তিক কর্মসূচির বিষয়। শ্রমজীবী, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বাস্তব সমস্যাকে রাজনীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। আয়বৈষম্য, নগর-গ্রাম ব্যবধান, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা-এসব প্রশ্নকে স্লোগান নয়, তথ্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আলোচনায় আনলে রাজনৈতিক বিতর্ক পরিণত হবে। দুর্নীতি দমন, বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার মতো কাঠামোগত সংস্কারও এই ধারার অংশ হতে পারে।
রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ছাড়া মধ্যপন্থা টেকসই হয় না। ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের বদলে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, শত্রুতা-নির্ভর ভাষার বদলে নীতিনির্ভর বিতর্ক এবং প্রতিপক্ষকে নির্মূল নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ এখানে অপরিহার্য। সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখার প্রবণতা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে; সমালোচনাকে সংশোধনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা মধ্যপন্থার লক্ষণ।
সবশেষে, ১২ ফেব্রুয়ারি কোনো সমাপ্তি নয়; এটি একটি সূচনা। অস্থিতিশীলতার গহ্বর এড়িয়ে চলা এবং উগ্রতার ঢেউ থেকে দূরে থাকা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু রাষ্ট্রদর্শন কেবল বিপদ এড়ানোর কৌশল নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের রূপরেখা। এখন প্রয়োজন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক ও গবেষণাসমর্থিত রাজনৈতিক বিকল্প-যা মধ্যপন্থাকে সাময়িক সমঝোতা নয়, দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারে রূপান্তর করবে। সামাজিক-গণতান্ত্রিক শক্তির উত্থান সেই পথে একটি সম্ভাব্য মাইলফলক হতে পারে। যদি সে প্রচেষ্টা বিশ্বাসযোগ্যভাবে শুরু হয়, তবে ১২ ফেব্রুয়ারির সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে আরও স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
Comments