তারেক রহমানের সামনে রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) জোট। দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে এই ফলাফল শুধু একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়, বরং নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা। এখন প্রশ্ন একটাই-এই বিপুল জনসমর্থনকে কি তিনি রাষ্ট্রনায়কোচিত দূরদর্শিতায় রূপ দিতে পারবেন?
বাংলাদেশের রাজনীতি গত এক দশকে প্রবল মেরূকরণ, অবিশ্বাস ও প্রতিহিংসার আবর্তে ঘুরেছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে জনঅসন্তোষের জেরে, অভিযোগ ছিল নিপীড়নমূলক শাসন, ভিন্নমত দমন এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে দুর্নীতি।
কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পরও কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা ফেরেনি। নানা জায়গায় মব-উচ্ছৃঙ্খলতা,আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং রাজনৈতিক প্রতিশোধস্পৃহা পরিস্থিতিকে অস্থির করে তুলেছে। এই বাস্তবতায় তারেক রহমানের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ-রাষ্ট্রক্ষমতাকে প্রতিহিংসার অস্ত্র না বানিয়ে, সেটিকে ন্যায় ও নিয়মের কাঠামোয় স্থাপন করা।
ভারত বাংলাদেশ শুধু একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনে গভীরভাবে সংযুক্ত এক সঙ্গী। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সুশাসন না এলে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়বে সমাজের সব স্তরে, আঞ্চলিকভাবেও। ফলে তারেক রহমানের সামনে দায়িত্ব কেবল দল পরিচালনার নয়, সামাজিক ভারসাম্য রক্ষারও।
অর্থনীতি এখন সবচেয়ে জ্বলন্ত ইস্যু। বিনিয়োগে স্থবিরতা, শিল্প কারখানা বন্ধ,উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বেকারত্ব-এই চারটি সমস্যা নতুন সরকারের জন্য অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তরুণ জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়ো শক্তি,আবার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলে সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে। তাই ব্যাবসাবান্ধব পরিবেশ, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ-এই তিনটিকে একসঙ্গে এগোতে হবে। বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো আজ সময়ের দাবি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে প্রণোদনা, দক্ষতা উন্নয়ন ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না করলে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়।
দুর্নীতি প্রশ্নে নতুন সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা সবচেয়ে বেশি পরীক্ষিত হবে। অতীতের অভিযোগকে হাতিয়ার করে যদি নতুন ক্ষমতাসীনরা একই পথে হাঁটে, তবে ম্যান্ডেট দ্রুত ক্ষয়ে যাবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা-এই তিনটি সংস্কারমূলক পদক্ষেপ ছাড়া সুশাসন কেবল স্লোগান হয়েই থাকবে। তারেক রহমান বারবার "সবাইকে নিয়ে এগোনোর" কথা বলেছেন, সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য বিরোধী কণ্ঠস্বরের প্রতি সহনশীলতা দেখানোই হবে প্রথম পরীক্ষা।
পররাষ্ট্রনীতিতেও সামনে কঠিন সমীকরণ। গত কয়েক বছরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে টানাপোড়েন বেড়েছে। এক সময়ের উষ্ণতা শীতলতায় পরিণত হয়েছে। অথচ বাণিজ্য, জ্বালানি,নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা-সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতা গভীর। "বাংলাদেশের স্বার্থ সবার আগে"-এই নীতি যদি বাস্তবসম্মত কূটনীতির সঙ্গে মিলিয়ে প্রয়োগ করা যায়, তবে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক পুনর্গঠনের সুযোগ রয়েছে। ভারতের সঙ্গেই নয়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর অর্থনৈতিক বলয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণের পথও খুলতে হবে।
সব মিলিয়ে তারেক রহমানের সামনে পরিস্থিতি দ্বিমুখী-একদিকে বিপুল জনসমর্থনের সুযোগ, অন্যদিকে প্রত্যাশার পাহাড়প্রমাণ চাপ। ইতিহাস বলছে, ক্ষমতায় আসা কঠিন, কিন্তু ক্ষমতা ধরে রেখে আস্থা অর্জন করা আরও কঠিন। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক সহনশীলতা, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং কর্মসংস্থান-এই চারটি স্তম্ভের ওপর যদি নতুন সরকার ভর করতে পারে, তবেই তিনি কেবল দলীয় নেতা নন, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। এখন দেখার, এই অধ্যায় কি প্রতিশোধের ধারাবাহিকতা বহন করবে,না কি পুনর্মিলন ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির ভিত্তিতে এক পরিণত গণতন্ত্রের পথে হাঁটবে। তারেক রহমানের নেতৃত্ব সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে।
Comments