ব্যালটের মাধ্যমে নতুন বাংলাদেশের খোঁজ
রাজনৈতিক মঞ্চ বদলে গেছে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে। যে রাস্তায় একদিন স্লোগান উঠেছিল পরিবর্তনের, সেই পথ এখন গিয়েছে ব্যালট বাক্সের দিকে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই দিনে গণভোট-বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভিনব আয়োজন। সংসদ নির্বাচনের দিনে গণভোট, এর আগে হয়নি। ফলে ভোটের দিনটি কেবল সরকার গঠনের নয়, রাষ্ট্রকাঠামো নিয়ে জনমতেরও এক পরীক্ষা। কাল বৃহস্পতিবার সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়েন। তিন দিন পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয় রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব রূপ আজকের ভোট। গণতন্ত্রের চাকা থেমে ছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু নতুন করে ঘোরানোর এই প্রয়াসে জনতার অংশগ্রহণই হবে চূড়ান্ত মাপকাঠি।
নিবন্ধিত ৬০ দলের মধ্যে ৫০টি অংশ নিচ্ছে এবারের নির্বাচনে। সরকারের নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং পরে ইসির নিবন্ধন স্থগিত হওয়ায় আওয়ামী লীগে নেই। দীর্ঘদিনের শাসকদলের অনুপস্থিতি নির্বাচনি অঙ্ককে যেমন : বদলে দিয়েছে, তেমনি বদলে দিয়েছে মনস্তত্ত্ব। দলীয় সরকারের অধীনে আগের তিন সংসদ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল হতাশাজনক। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নবম সংসদ নির্বাচন ছিল শেষ বড়ো উচ্ছ্বাসের দিন। তারপর এক দশকের বেশি সময় ধরে ভোটকেন্দ্র বিমুখতা যেন নীরব অভ্যাস হয়ে উঠেছিল।
এবার সেই অভ্যাস ভাঙার ইঙ্গিত মিলছে। সোমবার রাত থেকেই ঢাকামুখী নয়, ঢাকা ছাড়া মানুষের ঢল। বাস, লঞ্চ, ট্রেনে উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। গ্রামগুলো যাত্রা যেন এক সামাজিক উৎসবের আবহ তৈরি করেছে। সরকার ও ইসির কর্তা ব্যক্তিরা বলছেন, ভোটার উপস্থিতি ৫৫ শতাংশ ছাড়াতে পারে। এই সংখ্যাটি কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি আস্থার সূচক। তবে আস্থা ঘোষণায় নয়, প্রমাণে টিকে থাকে।
অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। দেশীয় ৫০ হাজারের বেশি পর্যবেক্ষক,২৩ দেশ ও সাত আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধির উপস্থিতি নজিরবিহীন। তবু অস্বস্তি কাটেনি পুরোপুরি। তপশিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনি সংঘর্ষে সরকারি হিসাবে পাঁচজন, বেসরকারি হিসাবে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। নারী ও সংখ্যালঘু ভোটারের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগ জমা পড়েছে ইসিতে। আচরণবিধি লঙ্ঘনের ৪৬১টি ঘটনা চিহ্নিত করে ২৫৯টি মামলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করেছে ৩২ লাখ ১৫ হাজার ৯৫০ টাকা। সংখ্যাগুলি বলছে প্রতিযোগিতা আছে, উত্তাপও আছে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতার অঙ্কও সরল নয়। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে শুরুতে বিএনপির বিজয় অনেকটাই নিশ্চিত বলেই মনে করা হয়েছিল। কিন্তু ২০ দিনের প্রচার শেষে এখন বহু আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র লড়াইয়ের আভাস মিলেছে। দীর্ঘ ২৫ বছরের রাজনৈতিক সঙ্গী-এবার তারা প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। অর্ধশতাধিক আসনে বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত বিদ্রোহীরাও সমীকরণ জটিল করেছে। গণতন্ত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সুস্থতার লক্ষণ, কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা যদি সংঘাতে রূপ নেয়, তবে সেই সুস্থতা ভঙ্গুর।
২৯৯ আসনে মোট প্রার্থী ২,০২৮ জন। এর মধ্যে দলীয় ১,৭৫৫, স্বতন্ত্র ২৭৩। নারী প্রার্থী ৮৩ জন। সংখ্যাটি এখনও সামান্য, কিন্তু শূন্য নয়-এটুকুই আপাত সান্ত্বনা। সারাদেশে ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০, তৃতীয় লিঙ্গের ১,২৩২ জন। এই বিপুল জনসমষ্টির প্রত্যেকটি ভোটই সমান মূল্যবান-গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড়ো সৌন্দর্য এখানেই।
৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র,২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২টি বুথ। অর্থাৎ প্রতি তিন হাজার ভোটারের জন্য একটি কেন্দ্র। কিন্তু পরিসংখ্যানের আরেকটি দিকও আছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ৪০ শতাংশের বেশি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে, ইসি বলছে,২১ হাজার ৫০৬টি কেন্দ্র 'গুরুত্বপূর্ণ'। ঢাকার দুই সিটির ১৫টি আসনে ঝুঁকি বেশি। অর্থাৎ ব্যালটের লড়াইয়ের পাশাপাশি নিরাপত্তার লড়াইও সমান্তরাল।
একই সঙ্গে হচ্ছে গণভোট। জুলাই সনদে জনসমর্থন আদায়ের এই আয়োজন রাজনৈতিক ঐকমত্যের ফল। সংসদ ও গণভোটের ফল একসঙ্গে গণনা হবে, সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে গণভোটের ফল ঘোষণা করা হবে। অর্থাৎ নাগরিকেরা কেবল প্রতিনিধি বেছে নেবেন না, নীতিগত দিকনির্দেশও দেবেন। এটি গণতন্ত্রকে প্রতিনিধিত্বমূলক থেকে কিছুটা অংশগ্রহণমূলক ধারায় নিয়ে যাওয়ার প্রয়াস।
তবে সব আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু একটিই এবং তা হলো বিশ্বাস। ভোটার যদি মনে করেন, তাঁর ভোট গণনা হবে, প্রতিফলিত হবে, তবেই তিনি কেন্দ্রমুখী হবেন। আর যদি সন্দেহ জাগে, তবে উৎসবের আবহও নিস্তেজ হয়ে যাবে। গণতন্ত্রের শক্তি কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নয়, গ্রহণযোগ্যতায়।
আজকের দিনটি তাই কেবল ক্ষমতার পালাবদলের সম্ভাবনা নয়, এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরীক্ষাও। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান যে প্রত্যাশা জাগিয়েছে -স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, অংশগ্রহণ-তা পূরণ হবে কি না, তার প্রথম উত্তর লুকিয়ে আছে এই ব্যালটে। রাতেই বেশির ভাগ ফল জানা যেতে পারে। কিন্তু প্রকৃত ফলাফল বোঝা যাবে সময়ের সঙ্গে। নতুন সংসদ কতটা আস্থা ফেরাতে পারে, গণভোটের নির্দেশ কতটা বাস্তবায়িত হয়, এবং সবচেয়ে বড়ো কথা, নাগরিকেরা আবার নিয়মিতভাবে কেন্দ্রমুখী হন কি না সবই বলবে এই নির্বাচন।
মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে তাই প্রশ্ন একটাই-বাংলাদেশ কি ব্যালটের ভেতর দিয়ে নতুন রাজনৈতিক পর্বে প্রবেশ করছে? উত্তর লিখবেন ভোটাররাই।
Comments