ঐক্যমত্যের নামে বিভাজন
ঢাকা জার্নাল বিশ্লেষণ
অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার যে কয়টি কমিশন করেছিল,তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত এবং সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা জাগানো ছিল ঐকমত্য কমিশন। নামে ছিল ঐক্য,লক্ষ্যও ছিল জাতীয় ঐকমত্য। কিন্তু সময়,অর্থ আর রাজনৈতিক শক্তি ব্যয় করে শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি আজ নির্মমভাবে সামনে দাঁড়িয়েছে -এই কমিশন জাতিকে কী দিল?
১২ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয়ে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় নয় মাস কাজ করেছে এই কমিশন। প্রধান হিসেবে ছিলেন স্বয়ং অধ্যাপক ইউনুস,আর সহ-সভাপতি হিসেবে দৃশ্যমান ছিলেন মার্কিন নাগরিক ড. আলী রিয়াজ। কোটি টাকা ব্যয়,রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একের পর এক বৈঠক,ব্যাপক আপ্যায়ন ভাতা- সব মিলিয়ে এটি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে 'হাই-প্রোফাইল' উদ্যোগ।
উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট: জাতীয় ঐকমত্য গঠনের জন্য রাজনৈতিক দল ও শক্তিগুলোর সঙ্গে আলোচনা। কিন্তু বাস্তব ফলাফল কী?
সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার জায়গা - ঐকমত্যের অনুপস্থিতি। আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে বাকি সব দলকে নিয়ে যে ঐক্য প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তা শেষ পর্যন্ত বিভাজনে পড়েছে। দীর্ঘ আলোচনার পরও তথাকথিত জুলাই সনদে শেষ পর্যন্ত স্বাক্ষর করল না এনসিপি,যাদের অধ্যাপক ইউনুস নিজেই নিয়োগকর্তা হিসেবে পরিচিতি দিয়েছেন।
এখানেই শেষ নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের বদলে বরং অনৈক্য আরও স্পষ্ট হয়েছে। জামায়াত–এনসিপি নির্বাচনী জোট হোঁচট খেয়েছে, বিএনপি–জামায়াত বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। জামাতের সাথে দ্বন্ব তৈরি হয়েছে খেলাফত মজলিশের মাওলানা মামুনুল হক ও চরমোনাই পীর খ্যাত মাওলানা সৈয়দ রেজাইল করীমের। অর্থাৎ কমিশনের কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগেই রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র হয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে সামাজিক স্তরে। যে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার জুলাই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, তারা আজ আক্রান্ত। বাম রাজনৈতিক শক্তিগুলো হামলার শিকার। মত প্রকাশের পরিসর সংকুচিত হচ্ছে। মব নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সরকার নিজেও দৃশ্যত কোনো আস্থার জায়গা তৈরি করতে পারেনি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব,নাগরিক সমাজ এবং রাষ্ট্রযন্ত্র - সবখানেই এক ধরনের পারস্পরিক অবিশ্বাস দানা বেঁধেছে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠছে - ঐকমত্য কমিশন কি কেবল একটি ব্যয়বহুল আনুষ্ঠানিকতা ছিল? নাকি এটি ছিল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি 'ইমেজ ম্যানেজমেন্ট' প্রকল্প, যেখানে আলোচনার চেয়ে উপস্থিতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল?
জাতীয় ঐকমত্য কাগজে-কলমে তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়, যেখানে প্রধান প্রধান মতাদর্শ ও শক্তিগুলোকে বাইরে রাখা হয় না। কমিশন এবং দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সেই মৌলিক সত্যটি উপেক্ষা করেছে। ফলে এটি বাস্তব রাজনীতির সঙ্গে সংযোগ হারিয়ে একটি এলিট-চালিত আলোচনা ফোরামে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনে সাধারণ মানুষ,শিক্ষার্থী,তরুণ সমাজ-অনেকে এতে যুক্ত হয়েছিলেন। শুরুতে মনে হয়েছিল,এটি একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন হবে। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই দেখা গেল,আন্দোলনের ভেতরেই নানা ধরনের বিবাদ,মতভেদ আর বিভক্তি তৈরি হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে-এত শক্তি থাকার পরও এই বিবাদ কেন?
প্রথম কারণ হলো স্পষ্ট নেতৃত্বের অভাব। জুলাই আন্দোলনের কোনো একক নেতা বা পরিষ্কার নেতৃত্ব কাঠামো ছিল না। কে সিদ্ধান্ত নেবে,কে কথা বলবে,কে আন্দোলনের দিক ঠিক করবে-এই বিষয়গুলো পরিষ্কার ছিল না। ফলে অন্তবর্তী সরকার গঠনের পর অনেকেই নিজেকে নেতৃত্বের জায়গায় দেখতে চেয়েছেন, সবাই নিজেদের সরকার ভাবতে শুরু করেছেন,আর সেখান থেকেই দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে।
দ্বিতীয় কারণ হলো ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য। সবাই একই কারণে আন্দোলনে নামেনি। কেউ চেয়েছে নির্দিষ্ট কিছু দাবি আদায় করতে,কেউ চেয়েছে বড় রাজনৈতিক পরিবর্তন,আবার কেউ ভবিষ্যতের রাজনীতিতে নিজের অবস্থান তৈরি করতে। একটা বড় অংশ চেয়েছে রাতারাতি ধন সম্পদের মালিক হতে। লক্ষ্য এক না হলে মতভেদ হওয়াই স্বাভাবিক।
তৃতীয়ত,আন্দোলনকে "অরাজনৈতিক" বলা হলেও বাস্তবে দলীয় রাজনীতির প্রভাব ছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে দলীয় স্বার্থে আন্দোলন ব্যবহার করার অভিযোগ করতে থাকে। এতে বিশ্বাসের জায়গায় ফাটল ধরে।
চতুর্থ কারণ হলো অভিজ্ঞতার ঘাটতি। আন্দোলনের বড় অংশ ছিল তরুণদের হাতে। তারা সাহসী ও আন্তরিক হলেও বড় আন্দোলন চালানোর অভিজ্ঞতা অনেকের ছিল না। ফলে আবেগের বশে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে,ছোট সমস্যা বড় করে দেখা হয়েছে,যা বিবাদ বাড়িয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিভাজনের কৌশল। আমাদের ইতিহাসে দেখা যায়,যেকোনো বড় আন্দোলনকে দুর্বল করতে ভেতরের বিভাজনকে কাজে লাগানো হয়। গুজব,সন্দেহ,ব্যক্তিগত আক্রমণ-এসব আন্দোলনের ঐক্য নষ্ট করে দেয়।
সবশেষে বলা যায়,জুলাই আন্দোলন শক্তিশালী ছিল ঠিকই, কিন্তু সংগঠন,নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ রূপরেখার অভাব এর বড় দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায়। বেঝা গেল, শুধু আবেগ নয়,ঐক্য,ধৈর্য আর পরিষ্কার দিকনির্দেশ ছাড়া কোনো আন্দোলন দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে না।
Comments