তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন : নানা সমীকরণ
তারেক রহমানের দেশে ফেরার ঘোষণাকে ঘিরে বিএনপির ভেতরে যে উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে, তা রাজনৈতিকভাবে বোধগম্য। দীর্ঘ ১৭ বছর পর দলের প্রধান নেতা দেশে ফিরছেন, এটি আবেগ তৈরি করবেই। কিন্তু আবেগের আড়ালে যে কঠিন বাস্তবতা অপেক্ষা করছে, তা উপেক্ষা করতে পারছে না বিএনপি সহ দেশের সংবেদনশীল সমাজ।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না; এটি ছিল দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে এক বিস্ফোরণ। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের ফেরার সুযোগ তৈরি হলেও তিনি অপেক্ষা করেছেন। নির্বাচনের তারিখ চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁর নীরবতা বলে দেয়, এই প্রত্যাবর্তন আদর্শিক নয়, কৌশলগত।
কিন্তু কৌশল দিয়ে কি বর্তমান বাস্তবতা মোকাবিলা করা সম্ভব?
আজ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো ক্ষমতার বিরোধিতা নয়, আদর্শিক শূন্যতা। আওয়ামী লীগের পতনের পর যে জায়গাটি বিএনপি পূরণ করতে পারত, সেখানে দ্রুত প্রবেশ করেছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের আদর্শিক সহযোগীরা। ছাত্ররাজনীতিতে জামায়াতের উত্থান, বিশেষ করে ডাকসু সহ সবগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট করে দিয়েছে, ভবিষ্যৎ রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ কার দিকে যাচ্ছে।
এটি নিছক ছাত্ররাজনীতির বিষয় নয়। বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি বরাবরই রাষ্ট্রক্ষমতার পরীক্ষাগার। সেখানে জামায়াতের ধারাবাহিক সাফল্য মানে, তারা কেবল সংগঠিত নয়, বরং একটি সুসংহত রাজনৈতিক বয়ান জনগণের সামনে তুলে ধরতে পেরেছে। অন্যদিকে বিএনপি এখনো মূলত "আওয়ামী লীগ বিরোধিতা"র বাইরে একটি শক্ত রাজনৈতিক দর্শন হাজির করতে ব্যর্থ।
এর চেয়েও বড়ো সংকট হলো, তারেক রহমানের সামনে এখন আওয়ামী লীগ নেই, কিন্তু আছে এক শক্তিশালী, আদর্শিকভাবে সুসংগঠিত এবং সামাজিকভাবে সক্রিয় একটি অতি উগ্র ডানপন্থি প্রতিপক্ষ। এই প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করতে হলে শুধু নির্বাচনী কৌশল নয়, প্রয়োজন স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান।
নির্বাচনী সহিংসতার আশঙ্কা এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। বিএনপির অভ্যন্তরে মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ নতুন নয়, তবে ক্ষমতার কাছাকাছি এলে এই দ্বন্দ্ব বিস্ফোরক আকার নেয়, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তার সাক্ষী। তারেক রহমান যদি দলীয় শৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে না পারেন, তাহলে বিএনপি নিজেই নিজের সবচেয়ে বড় শত্রুতে পরিণত হবে।
এদিকে জামায়াতের রাজনৈতিক প্রচারণা কৌশল লক্ষ করার মতো। তারা নিজেদের দুর্নীতিবিরোধী ও নৈতিক রাজনীতির বাহক হিসেবে উপস্থাপন করছে, আর বিএনপিকে পুরোনো, দখলদার ও সুবিধাভোগী শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করছে। এই বয়ান সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, রাষ্ট্রের নীতিগত ঝোঁক। সাম্প্রতিক সময়ে সংস্কৃতি, গণমাধ্যম ও নাগরিক পরিসরে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার ভয়ংকর দৃষ্টান্ত হলো প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট বা উদীচীর ওপর হামলার ঘটনাগুলো। এগুলো ইঙ্গিত দেয়, রাষ্ট্র ধীরে ধীরে একটি সংকীর্ণ আদর্শিক পথে এগোচ্ছে, যেখানে উদারনৈতিক রাজনীতির জায়গা ক্রমশ সংকুচিত।
এই বাস্তবতায় তারেক রহমানের সামনে প্রশ্ন একটাই নয় যে, তিনি নির্বাচন জিততে পারবেন কি না। বরং প্রশ্ন হলো, তিনি কি আদৌ এই রাজনৈতিক ধারার বিপরীতে দাঁড়াতে চান?
যদি তাঁর রাজনীতি কেবল ক্ষমতার পুনর্বণ্টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, আওয়ামী লীগের জায়গায় বিএনপি, তাহলে দেশের মৌলিক সংকটের কোনো সমাধান হবে না। বরং একটি কর্তৃত্ববাদী কাঠামোর জায়গায় আরেকটি কাঠামো বসবে, যার ভেতরে আদর্শিকভাবে আরও শক্তিশালী ডানপন্থীরা জায়গা করে নেবে।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন তাই একটি সুযোগ নয়, বরং একটি চূড়ান্ত পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হলে তাঁকে শুধু নেতা নয়, একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক দর্শনের বাহক হতে হবে। নইলে ইতিহাসে তাঁর প্রত্যাবর্তন লেখা থাকবে-একটি হারানো সুযোগ হিসেবে।
Comments