সংসদকে বাধ্য করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করছে কমিশন
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান-সংক্রান্ত সুপারিশগুলো টেকসইভাবে বাস্তবায়নের জন্য আগামী জাতীয় সংসদকে দ্বৈত ভূমিকা দেওয়ার প্রস্তাব বিবেচনা করছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদ ২৭০ দিন (৯ মাস) সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে এবং একইসঙ্গে নিয়মিত সংসদীয় কার্যক্রমও পরিচালনা করবে এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সনদের বাস্তবায়নে সংসদকে বাধ্য করার উপায় খুঁজছে কমিশন। এ কারণেই গত দুই দিন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক করলেও চূড়ান্ত সুপারিশমালা অনুমোদন করতে পারেনি তারা।
বৃহস্পতিবার (২৩ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে কমিশনের কার্যালয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। দুপুর ২টা থেকে শুরু হয়ে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত বিরতি দিয়ে টানা ছয় ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে এই বৈঠক। কমিশন আশা করছে, আগামী শনিবার তৃতীয় দিনের বৈঠকে সুপারিশ চূড়ান্ত করে সেদিনই বা পরদিন সরকারের কাছে জমা দেওয়া সম্ভব হবে।
কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, আজকের আলোচনায় আমরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছি। আশা করছি, দ্রুতই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ জমা দিতে পারব।
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সদস্য জানান, সনদ বাস্তবায়নের আদেশের নাম ও ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। আলোচনায় বলা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানই হবে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশের ক্ষমতার উৎস। সম্ভাব্য নাম হতে পারে—'জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ'। এর অধীনে একটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে।
কমিশনের সূত্রে জানা যায়, আগামী সংসদকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সনদ বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা আরোপের বিষয়ে আলোচনা চলছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদ ৯ মাসের মধ্যে সংস্কার বাস্তবায়ন করবে। এ সময় সংসদ নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও কাজ করবে।
কমিশনের এক সদস্য বলেন, আজকের বৈঠকেও আমরা এখনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারিনি, সংসদকে কীভাবে সনদ বাস্তবায়নে বাধ্য করা যাবে। বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে আমরা দুটি মতামত পেয়েছি—একটি মতে, নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন না হলে সংসদ বিলুপ্ত হবে, অন্য মত অনুযায়ী, সময়সীমার মধ্যে সংসদ বাস্তবায়ন না করলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবায়িত বলে গণ্য হবে।
তিনি আরও বলেন, এই দুটি প্রস্তাব নিয়েই এখনও আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞ কমিটি খসড়া পুনর্বিবেচনা করবে এবং পরে চূড়ান্ত মত নির্ধারণ করা হবে।
বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন বিশেষজ্ঞ বলেন, যদি পরবর্তী সংসদ নির্ধারিত সময়ের (২৭০ দিন) মধ্যে বাস্তবায়ন সম্পন্ন না করে, তাহলে সনদের কী হবে—সেটিই এখন মূল আলোচনার বিষয়। কেউ বলছেন সংসদ বিলুপ্ত হওয়া উচিত, আবার কেউ মনে করছেন তা বাস্তবসম্মত নয়। অনেকেই মত দিয়েছেন, সংসদ ব্যর্থ হলে সনদের সংস্কারসমূহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানের অংশ হয়ে যাবে। তবে এখনও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
সূত্র জানিয়েছে, জুলাই সনদের আপত্তি (নোট অব ডিসেন্ট) নিয়ে আপাতত সিদ্ধান্ত হয়েছে যে আদেশে কমিশনের প্রস্তাবগুলোই থাকবে, তবে ভিন্নমতের উল্লেখ থাকবে না। গণভোটে দুটি প্রশ্ন থাকবে—আদেশ অনুমোদন করবেন কি না এবং প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়ন চান কি না।
এক বিশেষজ্ঞ বলেন, বেশিরভাগ সদস্যই 'জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশে' নোট অব ডিসেন্ট রাখার পক্ষে নন। তবে বিষয়টি নিয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ঐকমত্য কমিশনের সূত্রে আরও জানা গেছে, গণভোটের সময় নির্ধারণ রাজনৈতিক বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে ছেড়ে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। আদেশে একটি একক প্রশ্ন থাকবে—'আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ এবং এতে সন্নিবেশিত প্রস্তাবগুলো সমর্থন করেন?' জনগণ সেখানে হ্যাঁ/না ভোট দেবে।
কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এখন আমরা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করছি সদন বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে। তবে, সেখানে বেশ কিছু মতামত এসেছে। কিন্তু কোনোটাই চূড়ান্ত হয়নি।
কমিশনের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ খুব শিগগিরই সরকারের কাছে জমা দেওয়া সম্ভব হবে।
বৈঠকে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এম এ মতিন, সিনিয়র আইনজীবী ড. শরিফ ভূইয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন মোহাম্মদ ইকরামুল হক, ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিক ও ব্যারিস্টার তানিম হোসেইন শাওন। এ ছাড়া, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী ভার্চুয়ালি অংশ নেন।
কমিশনের পক্ষে অংশ নেন সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, সদস্য ড. বদিউল আলম মজুমদার, বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান ও ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া।
Comments