দারিদ্র্যের চাপে বাড়ছে আবাসন সংকট, নিরাপদ ঠিকানা কোথায়?
মাদার তেরেসা বলেছিলেন, একাকীত্ব এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বোধ করার মতো তীব্র দারিদ্র্য আর কিছু নেই। তবে যে মানুষটির দু-বেলা ভাত আর রাতে মাথা গোঁজার নাই ঠাই, তার কাছে একাকীত্বের চিন্তা যেন বিলাসিতাই বটে।
যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থায় কোনো ব্যক্তি তার জীবনধারণের জন্য খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের সামর্থ্য রাখে না, সেই অবস্থাকেই দারিদ্রতা বলে। মোটাদাগে দারিদ্রের সংজ্ঞাটা ঠিক এরকমই দাঁড়ায়।
অর্থনৈতিক সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অচলবস্থা ও জনসংখ্যার চাপের মতো সমস্যার কারণে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১১০ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে, যাদের একটা বড় অংশই বাস করে আফ্রিকা এবং দক্ষিণ এশিয়ার মতো অঞ্চলগুলোতে।
গেল ৬ অক্টোবর ২০২৬-এ প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের 'বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট' নামের এই প্রতিবেদনেই মিলেছে এসব তথ্যের প্রতিফলন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮.৭ শতাংশ। অর্থাৎ একই অর্থবছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এমনকি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই হার ২২.৮ শতাংশে উঠতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক।
এদিকে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে অবস্থান করছেন, যারা মূল্যবৃদ্ধি কিংবা যেকোনো দুর্যোগের ফলেই আবার নেমে যেতে পারে দারিদ্র্যসীমার নিচে। এমন উদাহরণ বাংলাদেশে কম নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কাজ হারানো, এমনকি নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতেই অনেকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যান। ফলে তাঁদের আয়ের সুযোগ আবারও কমে যায়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাকে রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অথচ ২০২৫ এ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত দেশের 'দারিদ্র্য মানচিত্র ২০২২' বলছে বরিশালের দারিদ্র্যের হার ২৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ থেকে সামান্য বেড়ে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে যা দেশের অন্যান্য বিভাগের মাঝে সর্বোচ্চ।
অন্যদিকে জেলা পর্যায়ে দেশের সর্বোচ্চ দারিদ্র্যের হার মাদারীপুরে ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের প্রায় তিনগুণ। রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর এলাকায় দারিদ্রতার হার সবচেয়ে বেশি ১৯ দশমিক ১ শতাংশ। একইসময় রাজধানীর মিরপুর এলাকার ভাষাণটেকে দারিদ্রতার হার ছিল ১৬ দশমিক ২ শতাংশ।
প্রতিবছর ১৭ অক্টোবর দিনটিকে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্য বিমোচন দিবস হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৮৭ সালের ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সের প্যারিসে প্রায় এক লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও সহিংসতার শিকার মানুষের স্মরণে জড়ো হয়েছিলেন। তারপর দিবসটিকে জাতিসংঘ ১৯৯২ সালে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়। এবারের দিবসের মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে, সবার জন্য নিরাপদ বাসস্থান।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে এক হাজার ২০০ জন মানুষ বাস করছে। রাজধানী ঢাকায় এ সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল শহরগুলোতে আবাসনের বড় ঘাটতি রয়েছে। বর্তমান ঘাটতি পূরণ এবং ভবিষ্যতের চাহিদা মোকাবিলায় ২০৩০ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার নতুন ঘর নির্মাণ প্রয়োজন হবে।
রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে আবাসন সংকট সবচেয়ে বেশি প্রকট। সীমিত জমি, বাড়তি ভাড়া, জমির উচ্চমূল্য এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের সীমিত ক্রয়ক্ষমতার কারণে অনেক মানুষের জন্য নিজস্ব বাড়ি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষকে দীর্ঘদিন ভাড়ার বাসায় থাকতে হয়।
সম্প্রতি কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এর এক জরিপে দেখা যায়, ঢাকার ৫৭ শতাংশ ভাড়াটিয়া তাদের আয়ের প্রায় অর্ধেক ব্যয় করেন কেবল বাসা-ভাড়ার পেছনে, আর ১২ শতাংশ ভাড়াটিয়ার ক্ষেত্রে এই হার ৭৫ শতাংশের কাছাকাছি।
আর যারা ভাড়া বাসায় থাকার সামর্থ্যও রাখেন না, তারা কোথায় থাকেন? দেশের সর্বশেষ জনশুমারি ২০২২ অনুযায়ী, দেশে গৃহহীন বা পথবাসী মানুষের সংখ্যা ২২ হাজার ১৮৫ জন। মোট জনসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা খুব বেশি মনে না হলেও এই পরিসংখ্যানের বাইরেরও রাজধানীতে রয়েছে অসংখ্য অনিরাপদ ও অনানুষ্ঠানিক বসতি। যাদের বেশিরভাগই থাকেন কড়াইল, আদাবর, ভাষানটেক ও কামরাঙ্গীরচরের মতে এলাকাগুলোতে।
অন্যদিকে প্রতিবছরই গ্রামীণ জনপদে নদীভাঙন, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে গড়ে ১৫ হাজার পরিবার ভিটেমাটি হারায়। ডাদের অনেকেই জীবিকার সন্ধানে শহরে চলে আসলে নগরের ওপর বাড়তি চাপে সৃষ্টি হয় বাড়তি আবাসন সংকট।
দিনশেষে সময় ও পরিস্থিতি শিকার হয়ে প্রায়ই ঠিকানা বদলায় মানুষ, কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। ঠিকানা বদলালেও অনিরাপদ ও অনানুষ্ঠানিক বসতিতে তাদের ভাগ্য আদৌ কতটা বদলায়?
Comments