নেপালে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের নিখোঁজ কর্মীদের সন্ধানে বিস্ফোরণ, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৯৫৫
নেপালের আকস্মিক বন্যায় ত্রিশূলি নদীসংলগ্ন সুড়ঙ্গজালের বিভিন্ন অংশে আটকা পড়া শত শত কর্মীর সন্ধানে পাহাড়ের ঢালে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নতুন পথ তৈরি করছেন উদ্ধারকর্মীরা। জীবিতদের উদ্ধারের সময় ফুরিয়ে আসায় সুড়ঙ্গের ভেতরে বাতাস পাম্প করার মতো জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রিয়জনদের জীবিত ফিরে পাওয়ার ক্ষীণ আশাটুকুও এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন স্বজনেরা।
প্রকল্প এলাকা থেকে নিখোঁজ ৩৩ বছর বয়সি প্রকৌশলী অরাস ভান্ডারীর স্ত্রী অনুশীলা ভান্ডারী বিবিসি নেপালিকে বলেন, 'আমি শুধু চাই যেন ওকে খুঁজে পাওয়া যায়। ও যেন অক্ষত অবস্থায় বাড়ি ফিরে আসে।'
নেপাল ও চীন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তে এই প্রলয়ংকরী বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫৫ জনে। দুই দেশ মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা পৌঁছেছে ৪ হাজার ৪৭১ জনে, যার মধ্যে অন্তত ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক। ধারণা করা হচ্ছে, নিখোঁজদের প্রতি সাতজনের মধ্যে প্রায় একজনই বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জানিয়েছেন, বিভিন্ন প্রকল্প এলাকা থেকে এ পর্যন্ত ২৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
চীন ও নেপালের যৌথ সামরিক বাহিনীর পাশাপাশি ভারত, কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার বিশেষজ্ঞরা এই আন্তর্জাতিক উদ্ধার অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
পাহাড়ি নদীনির্ভর নেপালে সাম্প্রতিক বন্যায় নির্মাণাধীন অন্তত ১১টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুড়ঙ্গের ভেতর অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা থাকায় বেঁচে থাকার আশা ছাড়ছেন না নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনেরা। তবে উদ্ধারকাজে হতাশা প্রকাশ করে জীবন খাড়কা নামের এক স্বজন বলেন, 'যত সময় গড়াচ্ছে, আমাদের আশাও তত ফিকে হয়ে আসছে। প্রতিটি সেকেন্ডই এখন আমাদের জন্য মহামূল্যবান, অথচ উদ্ধারকাজ হতাশাজনকভাবে ধীরগতিতে চলছে।'
পরিস্থিতি সামাল দিতে উদ্ধার তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, এই বন্যা কোনো 'স্বাভাবিক' ঘটনা নয়; বরং এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান চরম ঝুঁকির এক ভয়ানক দৃষ্টান্ত।
দূর থেকে নেপালি কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছেন অস্ট্রেলীয় প্রকৌশলী ও ইন্টারন্যাশনাল টানেলিং অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রধান আর্নল্ড ডিক্স। তিনি জানান, সুড়ঙ্গগুলোর কোনো বাস্তব চিহ্নই আর অবশিষ্ট নেই। চারপাশ দেখতে অবিকল চাঁদের পৃষ্ঠের মতো বিধ্বস্ত লাগছে। তিনি বলেন, 'এখানে এমন সব পাথর রয়েছে, যা একেকটি বাড়ির চেয়েও বড়। জীবনে আমি এমন দৃশ্য কখনো দেখিনি। এটি সত্যিই এক নজিরবিহীন অভিযান।' তবে ভূগর্ভস্থ পরিবেশ ওপরের প্লাবন থেকে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পেরেছে—এই বিবেচনায় মাটির নিচে আটকা পড়াদের বেঁচে থাকার ক্ষীণ আশা এখনো দেখছেন তিনি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ৯০০ মরদেহের মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। নদীর গতিপথে অনেক ভাটিতে অবস্থিত চিতওয়ান জেলায় প্রায় ৩০০ মরদেহ ভেসে আসায় সেখানে অস্থায়ীভাবে গণকবরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মরদেহের পচা দুর্গন্ধে ভারী হয়ে ওঠা পরিবেশে চিকিৎসাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা অজ্ঞাত মরদেহের অবশিষ্টাংশ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ চালাচ্ছেন।
প্রধান জেলা কর্মকর্তা গণেশ আরিয়াল জানান, মরদেহ সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ফ্রিজার না থাকায় এবং পরিস্থিতি সামর্থ্যের বাইরে চলে যাওয়ায় তাঁরা এই শেষ বিকল্প বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরবর্তীতে পরিচয় নিশ্চিত হলে স্বজনেরা দেহাবশেষ তুলে নিতে পারবেন।
চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতে সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা ১৬ এবং নিখোঁজ রয়েছেন ৫৪৬ জন। তবে চীনে এই বন্যার ভিডিও ও তথ্যের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়েছে। সরকারি হিসাবের চেয়ে হতাহতের সংখ্যা বেশি দাবি করে ইন্টারনেটে পোস্ট করায় অনেককে প্রশাসনিক শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, নেপালেও বন্যা সম্পর্কিত বিভ্রান্তিকর তথ্য মনে হওয়া অনলাইন বিষয়বস্তুগুলো ইন্টারনেট থেকে মুছে ফেলার নির্দেশ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ।
Comments