বিশ্ব তেলপথ হরমুজ, কীভাবে লাভবান ইরান
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ওপর শুল্ক বা টোল আরোপের চূড়ান্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দিকে যাচ্ছে ইরান। যদি এই পরিকল্পনা বাস্তায়ন হয়, তবে শুল্ক আদায়ের মাধ্যমে দেশটির প্রতি মাসে প্রায় ৪৫০ কোটি (৪.৫ বিলিয়ন) ডলার আয় হতে পারে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই তারা এই বিশাল অঙ্কের অর্থ সংস্থান করতে চায়।
মূলত সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত হওয়া জাতীয় অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং সামরিক শক্তির আধুনিকায়নের লক্ষ্যে এই অর্থের অর্জনের দিকে হাটছে ইরান। বিশেষ করে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির সরকার যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সাম্প্রতিক শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতির দাবিতে অনড় অবস্থান নিয়েছে। এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে হরমুজ প্রণালি, যেখান দিয়ে বিশ্বের মোট সমুদ্রজাত জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি উন্মুক্ত রাখতে ব্যাপক চেষ্টা চালাচ্ছেন, ঠিক তখনই ইরান পাল্টা ১০ দফার একটি এজেন্ডা পেশ করেছে। এই দাবিনামার অন্যতম শর্ত হলো হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বিশেষ অধিকারের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান এবং রাশিয়ার মতো একটি শক্তিশালী বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার রক্ষা।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে সাধারণত দৈনিক ১০০ থেকে ১৩৫টি জাহাজ যাতায়াত করে থাকে। এসব জাহাজে করে প্রতিদিন প্রায় আড়াই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ভারত, চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশিয়ার বড় বাজারগুলোতে যায়।
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই ৩৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সরু পথের নিয়ন্ত্রণ ইরান ও ওমানের হাতে থাকলেও বর্তমানে তেহরান সেখানে কড়া নজরদারি চালাচ্ছে।
যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরান ঘোষণা করেছিল যে তাদের অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই পথে চলাচল করতে পারবে না, যা ড্রোন হামলার আশঙ্কায় নৌ-বিমার খরচ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
যদিও বর্তমানে একটি বিশেষ ব্যবস্থার অধীনে কিছু জাহাজকে পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে, তবে তার বিনিময়ে জাহাজপ্রতি প্রায় ২০ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত শুল্ক আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু ইরান এই অর্থ মার্কিন ডলারের বদলে চীনা ইউয়ানে গ্রহণ করছে। যদিও ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো শুল্ক দেওয়ার কথা অস্বীকার করেছে, তবে আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন যে ইরানের এই আধিপত্য স্বীকার করে নিলে প্রতি মাসে তেলের ট্যাঙ্কার থেকেই অন্তত ৪৫০ কোটি ডলার আয় হতে পারে।
এই বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ইরানের অর্থনীতিতে একটি নতুন মেরুকরণ ঘটাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানি হুমকির প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১১০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা যুদ্ধের শুরুর তুলনায় প্রায় ৩৮ শতাংশ বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে তেলের দাম প্রতি গ্যালনে ৪ ডলার অতিক্রম করায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। ভারতের মতো দেশগুলো কর কমিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করলেও দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যয়ভার বহন করা কঠিন হয়ে পড়বে। যদি ইরানের দাবি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিকে একটি 'পরিচালিত করিডোর' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তবে জ্বালানি তেলের দাম কমার পরিবর্তে আরও বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
কৌশলগতভাবে ইরান নিজেকে পারস্য উপসাগরের 'গেটকিপার' (রক্ষক) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। তারা কেবল হরমুজ প্রণালি নয়, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মাধ্যমে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতেও পরোক্ষ প্রভাব বজায় রাখছে। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রপ্তানি সম্পূর্ণভাবে ইরানের মর্জির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তেহরান মনে করে, এই নিয়ন্ত্রণ তাদের ভবিষ্যতে যে কোনো মার্কিন বা ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করবে।
আইনি দিক থেকে ইরানের এই দাবির কোনো শক্তিশালী ভিত্তি নেই বলে মনে করেন অনেক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ।
জাতিসংঘের সমুদ্র আইন বিষয়ক কনভেনশন বা 'আনক্লজ' অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি একটি আন্তর্জাতিক জলপথ এবং এখানে সব দেশের জাহাজের অবাধ যাতায়াতের অধিকার রয়েছে। ওমান এই আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে চললেও ইরান তাদের উপকূলীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অজুহাত দেখিয়ে এই প্রণালির ওপর তুরস্কের বোসফরাস প্রণালির মতো বিশেষ ব্যবস্থাপনাগত অধিকার দাবি করছে।
Comments