গাজিয়াবাদে নয়তলা থেকে পড়ে তিন বোনের মৃত্যু: তদন্তে উঠে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য
ভারতের উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদে একটি বহুতল ভবনের নয়তলা থেকে পড়ে ১৬ বছরের কম বয়সী তিন বোনের মৃত্যুর ঘটনা ঘিরে তদন্তে নেমে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাচ্ছে পুলিশ। দিল্লির উপকণ্ঠে অবস্থিত এই শহরের ঘটনাটি ইতিমধ্যেই দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বুধবার সকালে মেয়েদের বাবা চেতন কুমার সাংবাদিকদের দাবি করেছিলেন, তাঁর মেয়েরা একটি কোরীয় অনলাইন গেম খেলছিল এবং সেই গেমের শেষ 'টাস্ক' ছিল আত্মহত্যা করা। তবে সন্ধ্যায় পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে এ দাবি নাকচ করে দেয়। তদন্তকারীরা জানান, মেয়েরা মূলত তাদের বাবা–মায়ের মুঠোফোনে নিয়মিত কোরীয় নাটক দেখত। পুলিশের ধারণা, অতিরিক্ত আবেগঘন কনটেন্টের প্রভাব থাকলেও পারিবারিক আর্থিক সংকট ছিল বড় একটি কারণ।
পুলিশের তথ্যমতে, চেতন কুমার পেশায় শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারী এবং তাঁর ওপর প্রায় ২ কোটি রুপি ঋণের চাপ ছিল। আর্থিক সংকট এতটাই তীব্র ছিল যে বিদ্যুতের বিল মেটাতে মেয়েদের মুঠোফোন বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। তিনি মেয়েদের প্রায়ই বিয়ে দিয়ে দেওয়ার হুমকি দিতেন বলেও জানা গেছে। গত সপ্তাহে তিনি মেয়েদের ফোন ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেন। ১৬ বছর বয়সী নিশিকা, ১৪ বছরের প্রাচী ও ১২ বছরের পাখি—এই তিন বোন বিষয়টি নিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিবারের কাঠামোও ছিল জটিল। চেতন কুমারের দুই স্ত্রী—দ্বিতীয় স্ত্রী তাঁর প্রথম স্ত্রীর আপন বোন। প্রথম পক্ষের এক ছেলে ও এক মেয়ে এবং দ্বিতীয় পক্ষের এই তিন মেয়ে ছিল। করোনার পর আর্থিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় মেয়েদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। এ ছাড়া প্রথম স্ত্রীর ১৪ বছরের ছেলেটি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল, যা পরিবারে বাড়তি চাপ তৈরি করেছিল।
মঙ্গলবার দিবাগত রাত প্রায় ২টার দিকে বিকট শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা ঘটনাটি টের পান। পাশের ফ্ল্যাটের বাসিন্দা অরুণ সিং জানান, তিনি বড় মেয়েটিকে কার্নিশের দিকে যেতে দেখেছিলেন এবং অন্য দুই বোন তাকে ধরে রাখার চেষ্টা করছিল। এক পর্যায়ে তিনজনই নিচে পড়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ঘটনার পর অ্যাম্বুলেন্স আসতে প্রায় এক ঘণ্টা দেরি হয়।
পুলিশ ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে কিছু লেখা কাগজ, সিনেমার সংলাপ ও কবিতার মতো নোট, এবং একটি ৮ পাতার ডায়েরি উদ্ধার করে। সেখানে লেখা ছিল, "বাবা–মা যেন এটা পড়ে, কারণ সব সত্যি।" ঘরে পাওয়া একটি মুঠোফোনের ওয়ালপেপারে তিন বোনের ছবি ছিল এবং তারা নিজেদের জন্য কোরীয় নামও বেছে নিয়েছিল। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণঘাতী অনলাইন গেমের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি।
পুলিশ জানিয়েছে, পরিবারটি আগে উত্তর–পূর্ব দিল্লির খাজুরি খাস এলাকায় থাকত। যদিও অনেকে ২০১৭ সালের 'ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ'-এর ঘটনার সঙ্গে তুলনা করছেন, তদন্তকারীরা বলছেন, এ ঘটনায় সেই ধরনের কোনো প্রমাণ এখনো মেলেনি।
ঘটনার পূর্ণ কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।
Comments