নারী সাংবাদিকতার পথিকৃৎ নূরজাহান বেগমের জন্মদিন আজ: শ্রদ্ধায় স্মরণ
উপমহাদেশে নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত ও অনন্য পথিকৃৎ নূরজাহান বেগমের জন্মদিন আজ (৪ জুন)। ডাকনাম 'নূরী' হিসেবে পরিচিত এই প্রখ্যাত সম্পাদক বাঙালি মুসলিম নারীদের সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় যুক্ত করার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।
উপমহাদেশের প্রথম নারী সাপ্তাহিক পত্রিকা 'বেগম'-এর সূচনালগ্ন থেকেই তিনি এর সাথে যুক্ত ছিলেন এবং দীর্ঘ ছয় দশক অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পত্রিকাটির সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
নূরজাহান বেগম ১৯২৫ সালের ৪ জুন চাঁদপুরের চালিতাতলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পারিবারিক নিবাস ছিল পাইকারদী গ্রামে, যা মেঘনা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেলে তার পরিবার চালিতাতলিতে বসতি স্থাপন করে। তার পিতা মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং বিখ্যাত 'সওগাত' পত্রিকার সম্পাদক। মা ফাতেমা বেগম ছিলেন গৃহিণী।
শৈশবে, ১৯২৯ সালে তিনি পরিবারের সাথে কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে ১১ ওয়েলেসলি স্ট্রিটে 'সওগাত' পত্রিকার দপ্তরেই বসবাস শুরু করেন। কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে তার প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়।
'বেগম' পত্রিকা ও সংগ্রামী পথচলা
১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই নারীদের জন্য প্রথম সাপ্তাহিক পত্রিকা 'বেগম' প্রকাশিত হয়। তখন নূরজাহান বেগম বিএ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিলেন। শুরুতে পত্রিকাটির প্রথম সম্পাদক ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। তবে পরবর্তীতে নূরজাহান বেগম পত্রিকাটির সম্পাদনার সাথে গভীরভাবে যুক্ত হন এবং দীর্ঘ সময় এর হাল ধরেন।
১৯৫০ সালে তিনি প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক রোকনুজ্জামান খানের (দাদাভাই) সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং একই বছর বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) ফিরে আসেন। এরপর তিনি ঢাকার শরৎ গুপ্ত স্ট্রিটে দীর্ঘ সময় বসবাস করেন এবং সেখান থেকেই 'বেগম' পত্রিকার কাজ পরিচালনা করতে থাকেন। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে নারীদের লেখালেখিতে উৎসাহিত করতে তিনি নিজে বাড়ি বাড়ি গিয়ে লেখা ও ছবি সংগ্রহ করতেন।
'বেগম' পত্রিকার মাধ্যমে নূরজাহান বেগম নারীদের লেখা, ছবি ও মুক্ত মতামত প্রকাশের একটি অনন্য প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন। নারীদের অধিকার রক্ষা, শিক্ষা বিস্তার ও সামাজিক অগ্রগতিতে এই পত্রিকাটি এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে।
নারী জাগরণ, সাহিত্যচর্চা ও সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন। এর মধ্যে ১৯৯৭ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত 'রোকেয়া পদক' অন্যতম।
২০১৬ সালের ২৩ মে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯১ বছর বয়সে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই মহীয়সী নারী। আজ তার জন্মদিনে নারী সাংবাদিকতা ও অধিকার আন্দোলনের এই মহান অগ্রদূতকে গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
Comments