অর্ধেক ঈদ
শাহবাগের মোড়টা এখন কেবল একটি ভৌগোলিক সংযোগস্থল নয়, বরং তা যেন এক বিশালাকার বিষণ্ণ ক্যানভাস। সেখানে সময়ের তুলি দিয়ে কেউ একজন ধূসর রঙের প্রলেপ লাগিয়ে দিয়েছে। এক সময়ের জনসমুদ্র, স্লোগান আর তারুণ্যের কলকাকলিতে মুখরিত এই চত্বরটি এখন এক অদ্ভুত স্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। আকাশচুম্বী ভবনগুলোর গায়ের পোস্টারগুলো জীর্ণ হয়ে ঝুলে আছে; বাতাসের ঝাপটায় তারা শব্দ করে ওঠে, যেন কোনো অশরীরী আত্মা ফিসফিস করে বলছে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা। গণমুখী ভাস্কর্যের পাথুরে চোখগুলোতে এখন কেবল ক্লান্তি নয়, বরং এক ধরনের দার্শনিক ঔদাসীন্য কাজ করছে। মানুষের ভিড় আছে, কিন্তু সেই প্রাণের স্পন্দন নেই। প্রতিটি মানুষের ছায়ায় যেন দীর্ঘশ্বাসের ভার। রাজপথ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষের পদধ্বনি এখন অনেক বেশি স্পষ্ট শোনা যায়, কারণ যান্ত্রিক কোলাহল আজ অনেকটা স্তিমিত। ডলারের দরবৃদ্ধির গ্রাফটি যেন এক অদৃশ্য ড্রাগন, যা সাধারণ মানুষের স্বপ্নগুলোকে একে একে গিলে ফেলছে।
নাসির সাহেব নিউমার্কেটের দিকে পা বাড়াচ্ছেন। তাঁর দীর্ঘ পদক্ষেপে কোনো তাড়া নেই, বরং এক ধরণের অনিচ্ছা কাজ করছে। পকেটে হাত রাখলে আঙ্গুলে ঠেকে কয়েকটি নোটের খসখসে শব্দ। এই আঠারো মাসের অন্তর্বর্তীকালীন শাসনামল তাঁর জীবনের স্থিতিশীলতাকে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে দিয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাঝারি পদস্থ কর্মকর্তার যে আভিজাত্য বা নিশ্চয়তা থাকে, তা এখন নিছক এক মরীচিকা। বেতন হওয়ার সাথে সাথে তা বাজারদরের উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ে তলিয়ে যায়। রেশনের দীর্ঘ লাইন, ওষুধের দোকানের ভিড় আর রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার নিয়ে মানুষের হাহাকার—এসবই এখন ঢাকার নতুন মানচিত্র। মধ্যবিত্তের সম্মান এখন কাচের চুরির মতো ভঙ্গুর; একবার ভাঙলে তা জোড়া লাগানো অসম্ভব।
আজ ২৭ রমজান। আকাশের এক কোণে একফালি চাঁদ দেখা দিচ্ছে কি দিচ্ছে না, তা নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। সবার মাথাব্যথা আগামীকালের বাজারের ফর্দ নিয়ে। কাল শেষ তারাবি, তারপরই খুশির ঈদ। কিন্তু নাসির সাহেবের কাছে এই ঈদ যেন এক দূরবর্তী নক্ষত্র, যা কেবল দূর থেকে আলো দেয় কিন্তু উত্তাপ ছড়াতে পারে না।
নিউমার্কেটের তোরণ পেরিয়ে ভেতরে ঢোকা মাত্রই এক ধরণের অস্বস্তি গ্রাস করল তাঁকে। দোকানগুলোতে আলোকসজ্জা আছে, কিন্তু বিক্রেতাদের মুখে সেই পেশাদার হাসি নেই। তারা উদাসীন চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন কোনো অলৌকিক ক্রেতার প্রতীক্ষায়। নাসির সাহেবের চোখে পড়ল প্রতিবেশী ফারুক সাহেবকে। সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছেন তিনি, চোখেমুখে রাজ্যের অন্ধকার। ফারুকের জীবনের গল্পটাও নাসির সাহেবের মতোই সমান্তরাল। চাকরি হারানো, সন্তানের টিউশনি আর অভাবের সাথে নিত্য লড়াই।
"কী খবর ফারুক ভাই? কেনাকাটা কতদূর?" নাসির সাহেব মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করলেন।
ফারুক সাহেব এক ম্লান হাসি হাসলেন, যে হাসিতে আনন্দ নেই, আছে কেবল আত্মসমর্পণ। "নাসির ভাই, আমাদের মতো মানুষের জন্য এখন কেনাকাটা মানেই বিলাসিতা। সন্তানদের মুখে একবেলা ভালো খাবার তুলে দিতে পারাটাই এখন বড় উৎসব। ১৮০ টাকা কেজি দরের চিনি আর আকাশছোঁয়া সেমাইয়ের বাজারে আমরা হলাম সেই অভাগা পথিক, যে মরুভূমিতে মরীচিকার পেছনে ছুটছে। সামনে ঈদ আসছে ভাবলে এখন আর আনন্দ হয় না, বরং বুকটা কেঁপে ওঠে এক অজ্ঞাত আশঙ্কায়।"
ফারুক সাহেবের কথাগুলো যেন নাসির সাহেবের হৃদয়ের ক্ষতস্থানে লবণের ছিটার মতো লাগল। নিজের ঘরেও একই দৃশ্যকল্প। ক্লাস ফাইভের মেয়ে রুকাইয়ার পুরোনো জামাটা ছোট হয়ে এসেছে, ছেলের স্কুলের প্যান্টে তালি দেওয়া। লোডশেডিংয়ের সময় অন্ধকারে যখন ওরা পড়তে বসে, তখন নাসির সাহেবের মনে হয় তিনি অন্ধকার যুগের এক পরাজিত পিতা। ইনভার্টারের ব্যাটারিটা নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর থেকে সেই অন্ধকার আরও গাঢ় হয়েছে।
বাজারের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি এক কাপড়ের দোকানের সামনে থামলেন। সেখানে একজন ক্রেতা একটি সাধারণ সুতির শার্ট নিয়ে দরদাম করছিলেন। ক্রেতাটি সম্ভবত কোনো অফিসের পিয়ন বা স্বল্প আয়ের মানুষ।
"ভাই, এই শার্টটার দাম একটু কমান। বাচ্চার জন্য নেব।" ক্রেতার কণ্ঠে আকুতি।
বিক্রেতা খসখসে গলায় জবাব দিলেন, "দেখুন দাদা, আমদানি বন্ধ। এলসি খুলতে পারছি না। কাপড়ের রোল যা আছে তা সোনার দরে কিনতে হচ্ছে। ২২০০ টাকার নিচে এক পয়সাও কম হবে না। পোষালে নিন, না হলে পথ দেখুন।"
ক্রেতা ভদ্রলোক কিছুক্ষণ শার্টটির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখের মণি যেন কুঁচকে গেল। নিঃশব্দে শার্টটি নামিয়ে রেখে তিনি ভিড়ের মাঝে মিশে গেলেন। নাসির সাহেব বুঝলেন, এই মানুষটি আর কোনো দোকানে যাবেন না। তিনি ফিরবেন তাঁর সেই ঘিঞ্জি গলির অন্ধকার ঘরে, যেখানে তাঁর সন্তানটি হয়তো একটি রঙিন স্বপ্নের অপেক্ষায় জেগে আছে। মানুষের এই যে নিঃশব্দ হাহাকার, এর কোনো রেকর্ড কোনো সরকারের ফাইলে থাকে না। মুদ্রাস্ফীতির প্রতিটি পয়েন্ট বাড়ার মানে হলো হাজারো শিশুর রঙিন জামার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হওয়া।
বাজার থেকে বেরিয়ে চটপটি আর ফুচকার ঘ্রাণে ভরা ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে নাসির সাহেবের চোখ গেল এক ফেরিওয়ালার দিকে। সেকেন্ডহ্যান্ড বা এক্সপোর্ট কোয়ালিটির বাতিল পোশাক বিক্রি করছে সে। সেখানে এক বাবা দাঁড়িয়ে তাঁর পাঁচ-ছয় বছরের মেয়েকে নিয়ে। মেয়েটির পরনে জীর্ণ ফ্রক, কিন্তু চোখে এক অপার্থিব দ্যুতি। সে একটি গোলাপি রঙের ফ্রক ধরে ঝুলছে।
"আব্বু, এইটা দাও। ঈদে আমি এইটা পরে নামাজ পড়তে যাব।"
বাবার মুখটা মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাসে হয়ে গেল। তিনি দাম জিজ্ঞেস করলেন। ফেরিওয়ালা জানালো ৩৫০ টাকা। লোকটির হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এল। নাসির সাহেব স্পষ্ট দেখতে পেলেন লোকটির মানসিক দ্বন্দ্ব। ৩৫০ টাকা মানে হয়তো তিন দিনের সবজি, বা কয়েক কেজি চাল। বাবা মেয়েকে কোলে তুলে নিয়ে বললেন, "মা, এইটা তো ছোট হবে। কাল আমরা বড় দোকানে গিয়ে তোমার জন্য রাজকন্যার মতো জামা কিনব। এখন চলো।"
মেয়েটি কাঁদলো না, কিন্তু তার চোখের সেই দ্যুতিটা নিভে গেল। নাসির সাহেবের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। তিনি ভাবলেন, তাঁর পকেটে যে টাকাটা আছে তা দিয়ে রুকাইয়ার জন্য হয়তো কিছু কেনা যেত। কিন্তু এই মূহূর্তে এই অচেনা মেয়েটির বিষণ্ণ মুখটা তাঁর সহ্য হলো না। তিনি দ্রুত এগিয়ে গেলেন ফেরিওয়ালার কাছে। ৩৫০ টাকা দিয়ে জামাটা কিনে নিলেন।
"ভাই, শুনুন!" নাসির সাহেব ডাক দিলেন সেই বাবাকে।
লোকটি ফিরে তাকালেন, চোখে অবিশ্বাস। নাসির সাহেব জামার প্যাকেটটা মেয়েটির হাতে দিয়ে বললেন, "আমার মেয়ের জন্যও এই জামাটা কিনেছিলাম, কিন্তু ও একটু বড়। ওর হবে না মনে হচ্ছে। আপনার মেয়েটাকে দিলে আমার উপকার হয়। ঈদের উপহার হিসেবে নিন। কিছু মনে করবেন না।"
মেলে ধরা হাতের সেই গোলাপি জামাটি দেখে মেয়েটি খুশিতে চিৎকার করে উঠল। তার বাবা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। "আপনি কে ভাই? এই আকালে কেউ কাউকে একটা টাকা দেয় না, আর আপনি... আপনার কী নাম?"
নাসির সাহেব শুধু মৃদু হাসলেন। "আমার নাম কোনো বড় কথা নয় ভাই। নাম দিয়ে কী হয়? আমরা সবাই এক নৌকার যাত্রী। আপনার মেয়ের হাসিটাই আমার ঈদের বকশিশ।"
বাসায় ফেরার পথে নাসির সাহেবের মনটা অদ্ভুত এক প্রশান্তিতে ভরে গেল। পকেট শূন্য হতে পারে, কিন্তু হৃদয়ের ভাণ্ডার যেন পূর্ণ। বাসায় ফিরে দেখলেন বারান্দার গ্রিল ধরে রুকাইয়া রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। নিচে একদল তরুণ মিছিল করছে। তাদের হাতে বড় বড় জাতীয় পতাকা। সেই সবুজ ক্যানভাসে লাল বৃত্তটি বিকেলের রোদ লেগে যেন জ্বলজ্বল করছে। তাদের স্লোগান ছিল—'বাঁচতে চাই, ভাত চাই, মুক্তি চাই'।
রুকাইয়া বাবাকে দেখে এগিয়ে এল। "আব্বু, ওরা বলছে দেশ নাকি বদলে যাবে। সত্যিই কি বদলে যাবে? তাহলে কি সামনের ঈদে আমরা অনেক সেমাই আর চিনি কিনতে পারব?"
নাসির সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। তাঁর মনে হলো, এই শিশুগুলোর কাছে আমরা কত বড় ঋণী। আমরা তাদের একটি সুন্দর সকাল দিতে পারছি না। তিনি মেয়েকে কাছে টেনে নিয়ে বললেন, "মা, দেশ মানে কেবল মানচিত্র নয়। দেশ মানে মানুষ। মানুষ যদি মানুষের পাশে দাঁড়ায়, তবেই দেশ বদলে যায়। আজ তোমার জন্য নতুন জামা আনতে পারিনি মা, কিন্তু একটা গল্প এনেছি।"
নাসির সাহেব মেয়েকে এবং তাঁর স্ত্রীকে শোনালেন সেই গোলাপি জামার গল্প। তাঁর স্ত্রী প্রথমে একটু বিমর্ষ হলেও পরে শান্ত হলেন। "তুমি ঠিকই করেছ। আমরা হয়তো এ বছর ত্যাগের মধ্য দিয়েই ঈদ করব। আমাদের সামর্থ্য নেই অনেক কিছু করার, কিন্তু অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর সামর্থ্য তো সৃষ্টিকর্তা কেড়ে নেননি।"
রাতের ঢাকা আজ অন্যরকম। লোডশেডিংয়ের কারণে অধিকাংশ এলাকা অন্ধকার। কিন্তু এই অন্ধকারেরও নিজস্ব একটা ভাষা আছে। দূর থেকে ভেসে আসছে সাহরি ডাকার ঢোল। নাসির সাহেব বিছানায় শুয়ে ভাবছেন আগামীকালের কথা। কাল চাঁদরাত। হয়তো দেশের অনেক ঘরে কাল চুলো জ্বলবে না। হয়তো অনেক বাবা তাঁর সন্তানের চোখের দিকে তাকাতে পারবেন না। এই যে অন্তর্বর্তীকালীন সময়, যা এক অস্থিরতা থেকে অন্য অস্থিরতায় মানুষকে নিয়ে যাচ্ছে, তা কবে শেষ হবে?
পরদিন সকালে নাসির সাহেব বাজারে গেলেন। হাতে থাকা যৎসামান্য টাকা দিয়ে আধা কেজি মাংস, সামান্য সেমাই আর চিনি কিনলেন। ফেরার পথে দেখলেন ফারুক সাহেবের ঘরের জানালা দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। ফারুক সাহেবের স্ত্রী হয়তো চাল ভাজছেন। নাসির সাহেব তাঁর থলি থেকে সামান্য সেমাই আর চিনি নিয়ে ফারুক সাহেবের দরজায় কড়া নাড়লেন।
"ফারুক ভাই, এটা রাখুন। আমার শাশুড়ি গ্রাম থেকে পাঠিয়েছেন—মিথ্যে বললেন ফারুকের সম্মান বাঁচাতে। বাচ্চাদের ঈদের দিন একটু মিষ্টিমুখ করাবেন।"
ফারুক সাহেবের চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। তিনি কোনো কথা বলতে পারলেন না, শুধু নাসির সাহেবের হাতটা শক্ত করে ধরলেন। সেই হাতের স্পর্শে কোনো শব্দ ছিল না, কিন্তু ছিল এক গভীর কৃতজ্ঞতা এবং ভ্রাতৃত্বের অঙ্গীকার।
অবশেষে এল সেই বহু প্রতীক্ষিত ঈদের সকাল। আকাশটা আজ মেঘমুক্ত নীল। বৃষ্টির কোনো চিহ্ন নেই। নাসির সাহেব তাঁর পুরোনো পাঞ্জাবিটা ইস্ত্রি করে পরেছেন। রুকাইয়া পরেছে তার গত বছরের সেই কুর্তাটি, যা এখন তার হাঁটু পর্যন্ত পৌঁছায়। কিন্তু তার চেহারায় কোনো বিষণ্ণতা নেই। সে তার মার কাছ থেকে পাওয়া সেই লাল-সাদা-সবুজ প্লাস্টিকের চুড়িগুলো পরেছে। সেই চুড়ির শব্দে সারা ঘর মুখরিত।
"আব্বু, দেখ আমার চুড়ি! এগুলো কিন্তু দেশের রঙের চুড়ি!" রুকাইয়ার কণ্ঠে গর্ব।
নাসির সাহেব বুঝলেন, শিশুদের মন অনেক বেশি দার্শনিক। তারা দামি পোশাকের চেয়ে রঙের তাৎপর্য বেশি বোঝে। তিনি রুকাইয়াকে কোলে তুলে নিলেন।
নামাজের ময়দানে গিয়ে দেখলেন হাজারো মানুষের ভিড়। ধনী-দরিদ্রের ভেদাভেদ সেখানে নেই। কিন্তু সবার পোশাকে একটা জিনিস স্পষ্ট—মিতব্যয়িতা। আগের মতো জৌলুস নেই, নেই আতর আর গোলাপজলের সেই তীব্র সুবাস। কিন্তু সেখানে যা আছে, তা হলো সহমর্মিতা। কোলাকুলি করার সময় মানুষ আজ একে অপরকে একটু বেশি সময় জড়িয়ে ধরছে। যেন এই আলিঙ্গনেই তারা একে অপরের দুঃখ ভাগ করে নিতে চাইছে।
নামাজ শেষে ফেরার পথে নাসির সাহেব সেই লোকটিকে দেখলেন, যাকে তিনি গোলাপি জামাটি কিনে দিয়েছিলেন। লোকটির মেয়েটি সেই গোলাপি জামাটি পরে বাবার হাত ধরে হাঁটছে। সে যেন এক ফুটন্ত গোলাপ এই ধূসর শহরের বুকে। লোকটি নাসির সাহেবকে দেখে দূর থেকে সালাম দিলেন। সেই সালামের ভেতরে যে দোয়া ছিল, তা নাসির সাহেবের সারা জীবনের সঞ্চয়ের চেয়েও দামি মনে হলো।
বিকেলে বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলেন নাসির সাহেব। দূরে দেখা যাচ্ছে একটি পতাকা—বাতাসের ঝাপটায় তা সগৌরবে উড়ছে। নাসির সাহেবের মনে হলো, এই পতাকাটিই তো আমাদের অস্তিত্ব। এটি কখনো ঝড়ে ছিঁড়ে যায়, কখনো রোদে পুড়ে বিবর্ণ হয়, কিন্তু এটি কখনো পড়ে যায় না। মানুষের জীবনও ঠিক সেরকম। সংকট আসবে, ডলারের দাম বাড়বে, বাজার অস্থির হবে, যুদ্ধ হবে—কিন্তু মানুষের ভেতরের যে মৌলিক মমতা, তা কখনো ফুরিয়ে যাবে না।
ঈদ মানে কি কেবল নতুন জামার গন্ধ? নাকি ঈদ মানে একবেলার ভালো খাবার? না, নাসির সাহেবের কাছে আজ ঈদের সংজ্ঞা বদলে গেছে। ঈদ মানে হলো নিজের অভাবের মাঝেও অন্যের অভাবকে অনুভব করা। ঈদ মানে হলো সেই গোলাপি জামা পরা মেয়েটির হাসি, ফারুক সাহেবের কৃতজ্ঞ চোখের জল আর রুকাইয়ার প্লাস্টিকের চুড়ির রিনঝিন শব্দ।
তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবছে। এক অদ্ভুত লালিমা ছড়িয়ে পড়ছে দিগন্তে। এটি কি কোনো মহাপ্রলয়ের ইঙ্গিত? নাকি এক নতুন ভোরের প্রতিশ্রুতি? নাসির সাহেব বিশ্বাস করতে চান, এই সংকট চিরস্থায়ী নয়। জোয়ারের পর যেমন ভাটা আসে, তেমনি এই দুঃসময়ের পর সুসময় আসবেই। রুকাইয়ারা একদিন সত্যিকারের নতুন জামা পরবে, এই দেশের বাজারে আবার প্রাচুর্য ফিরবে। কিন্তু সেই সমৃদ্ধির দিনেও যেন মানুষ আজকের এই সংকটের শিক্ষাটি ভুলে না যায়—'মানুষ মানুষের জন্য'।
নাসির সাহেব ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। রুকাইয়া তাকে ডাকছে সেমাই খাওয়ার জন্য। জীবনের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আনন্দগুলোই এখন বেঁচে থাকার রসদ। এই পতাকার নিচে দাঁড়িয়ে তিনি স্বপ্ন দেখেন এক নতুন বাংলাদেশের, যেখানে কোনো বাবা তাঁর সন্তানের ইচ্ছের কাছে পরাজিত হবেন না। যেখানে ঈদ আসবে সবার ঘরে, সমান আনন্দ নিয়ে।
দূর থেকে ভেসে আসছে আযানের ধ্বনি। সেই ধ্বনি যেন শান্তি আর আশার বার্তা নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে এই বিশাল শহরের প্রতিটি অলিগলিতে। নাসির সাহেব মনে মনে বললেন, "ঈদ মোবারক আমার দেশ, ঈদ মোবারক আমার মানুষ।"
Comments