ইউরোপজুড়ে বিমানে বোমা আতঙ্ক, দুই দিনে হুমকির মুখে ৩৪ ফ্লাইট
ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আকাশে একের পর এক ভুয়া বোমা হামলার হুমকিতে তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। এসব হুমকির কারণে একাধিক আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের গতিপথ পরিবর্তন, জরুরি অবতরণ এবং ব্যাপক নিরাপত্তা তল্লাশি চালাতে হয়েছে। গত কয়েক দিনে অন্তত ৩৪টি বিমান এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। তবে তল্লাশির পর কোনো ফ্লাইটেই বিস্ফোরক বা সন্দেহজনক কিছু পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ইউরোপের অন্তত ১৬টি দেশের বিমান চলাচল এসব হুমকির কারণে বিঘ্নিত হয়। আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ইতালি, আয়ারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, স্পেন, বুলগেরিয়া, রোমানিয়া, পোল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, ফ্রান্স, গ্রিস, সার্বিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র। রায়ানএয়ার, এয়ার লিঙ্গাস, উইজ এয়ার, ফিনএয়ার, ইজিজেট, আইবেরিয়া, এয়ার সার্বিয়া ও এলওটি পোলিশ এয়ারলাইনসসহ বিভিন্ন সংস্থার ফ্লাইট এতে আক্রান্ত হয়।
যুক্তরাজ্যের হিথ্রো ও বার্মিংহাম বিমানবন্দরেও একাধিক হুমকি বার্তা আসে। পরে মেট্রোপলিটন পুলিশের অ্যাভিয়েশন পুলিশ কমান্ডের তদন্তকারীরা বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেন। হিথ্রোতে ওঠানামা করা চারটি বিমানের নিরাপত্তা মূল্যায়নেও কোনো ঝুঁকির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এর আগে মঙ্গলবার একই ধরনের হুমকির কারণে ইউরোপের সাতটি বিমানে তল্লাশি চালানো হয় অথবা সেগুলোর গতিপথ পরিবর্তন করা হয়। সোমবার যুক্তরাজ্য থেকে বুলগেরিয়াগামী একটি ফ্লাইটও হুমকির মুখে পড়ে। সব মিলিয়ে চলতি সপ্তাহে অন্তত ৩৩ থেকে ৩৪টি বিমান এমন ভুয়া সতর্কবার্তার শিকার হয়েছে।
ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন, নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাশিয়া বা ইরানের মতো কোনো রাষ্ট্র কিংবা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের প্রত্যক্ষ মদদের বিষয়ে নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এদিকে এসব ঘটনার তদন্তে ইউরোপজুড়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থা আইএটিএ বিমান চলাচলে এ ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টির নিন্দা জানিয়েছে। একই সঙ্গে হুমকিগুলোর উৎস শনাক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। আইএটিএর সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট নিক কেয়ারিন এক বিবৃতিতে বলেন, বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। তাই যেকোনো হুমকিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবহন কমিশনার অ্যাপোস্টোলোস সিটজিকোস্টাস বলেছেন, ঘটনাগুলোর মধ্যে পারস্পরিক কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। তবে সাধারণ নাগরিকদের লক্ষ্য করে এমন হুমকি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
তদন্তের মধ্যে ইতালির রোম ও বুলগেরিয়ার সোফিয়া বিমানবন্দরে পাঠানো হুমকি বার্তায় রাশিয়ার উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী 'মেল স্টেট'-এর নাম উঠে এসেছে। বার্তায় নিজেদের সংগঠনটির যোদ্ধা পরিচয় দিয়ে হুমকিদাতারা বিস্ফোরণের সতর্কবার্তা দেয়। পাশাপাশি নারীবাদবিরোধী বিদ্বেষমূলক বক্তব্যও প্রকাশ করে।
২০১৬ সালে ভ্লাদিস্লাভ পোজদনিয়াকভের প্রতিষ্ঠিত মেল স্টেট রাশিয়ার একটি অতি-জাতীয়তাবাদী ও নারীবাদবিরোধী সংগঠন হিসেবে পরিচিত। তবে বিমানবন্দরগুলোতে পাঠানো হুমকির সঙ্গে সংগঠনটির প্রকৃত সংশ্লিষ্টতা এখনো নিশ্চিত হয়নি। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতাও এ বিষয়ে কোনো দায় স্বীকার করেননি।
আয়ারল্যান্ডের কর্ক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে তারা টেলিফোনে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির কাছ থেকে একটি হুমকি পায়। এতে বিমান চলাচলে বিলম্ব হয়। অন্যদিকে রায়ানএয়ারের পেসকারা-ব্রাসেলস রুটের একটি বিমানের শৌচাগারের দেয়ালে 'বোমা' লেখা দেখতে পেয়ে নিরাপত্তা তল্লাশি চালানো হয়।
এ ছাড়া ডাবলিন থেকে ছেড়ে যাওয়া এয়ার লিঙ্গাসের একটি এয়ারবাস এ৩২০ বিমান বোমার হুমকির পর ফ্রান্সের ইভ্রেক্স সামরিক ঘাঁটিতে অবতরণ করে। এ ঘটনায় ঘাঁটিতে অবতরণ নিয়ে পাইলটের সঙ্গে ফরাসি কর্তৃপক্ষের জিজ্ঞাসাবাদের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে ইউরোপের সামগ্রিক বিমান চলাচলে এসব ঘটনার প্রভাব তুলনামূলক সীমিত ছিল। ইউরোকন্ট্রোলের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার ইউরোপের আকাশে প্রায় ২৭ হাজার ৪০০টি নির্ধারিত ফ্লাইট চলাচল করেছে।
বিমান চলাচলে এই অস্থিরতার আগে ইউরোপের বিভিন্ন সুপারমার্কেটের কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থায় সাইবার হামলার ঘটনাও সামনে আসে। এসব ঘটনার পেছনে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ তা অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয়ে ভিত্তিহীন অভিযোগ তোলার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেতো ইউরোপের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ধারাবাহিক বিঘ্নের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, হাসপাতালের রক্ত সরবরাহ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে পণ্য সংরক্ষণের অবকাঠামো এবং বিমান চলাচল ঘিরে ভুয়া আতঙ্ক তৈরির ঘটনাগুলোর পেছনে বৃহত্তর কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে 'আন্ডার-থ্রেশহোল্ড ওয়ারফেয়ার' বা প্রচলিত যুদ্ধের সীমার নিচে পরিচালিত সংঘাতের কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এ কৌশলে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়, যাতে কোনো পক্ষকে সরাসরি দায়ী করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অল্প সময়ের মধ্যে বিভিন্ন দেশে একাধিক বিশ্বাসযোগ্য হুমকি পাওয়ার ঘটনা সমন্বিত তৎপরতার ইঙ্গিত দিতে পারে। আধুনিক নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলেও আকাশে থাকা একটি বিমানের সামান্য ক্ষতিও ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটাতে পারে। এ কারণে হুমকি ভুয়া প্রমাণিত হলেও প্রতিটি ঘটনাতেই নিরাপত্তা তল্লাশি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয় এয়ারলাইনসগুলো।
ফ্লাইটের সময়সূচি ও উড্ডয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য ইন্টারনেটে সহজলভ্য হওয়ায় দুর্বৃত্তদের পক্ষে নির্দিষ্ট বিমানকে লক্ষ্য করে আতঙ্ক ছড়ানোও তুলনামূলক সহজ হয়ে উঠেছে। এতে ফ্লাইটের গতিপথ পরিবর্তন, অতিরিক্ত নিরাপত্তা তল্লাশি এবং যাত্রীদের ভোগান্তির পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে এয়ারলাইনসগুলো।
ওসপ্রে ফ্লাইট সলিউশনসের এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ রিস জোন্সের মতে, এমন পরিস্থিতিতেও বিমানবন্দরগুলোর প্রচলিত নিরাপত্তা প্রটোকল পরিবর্তন করা উচিত নয়। তবে এসব ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় নিরাপত্তা আরও জোরদার হলে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়তে পারে এবং গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত প্রচার তৈরি হতে পারে।
Comments