ভারত থেকে আমদানি করা চালে ‘ক্যান্সার সৃষ্টিকারী’ উপাদান শনাক্ত, বিতরণ স্থগিত
ভারত থেকে আমদানি করে চট্টগ্রাম ও ঢাকার সরকারি গুদামে সরবরাহ করা চালে সম্ভাব্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী বিষাক্ত উপাদান 'আফলাটক্সিন'-এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এ ঘটনার পর জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে ওই চালানের বাকি ৯ হাজার ৫০০ টন চালের বিতরণ সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে খাদ্য অধিদপ্তর।
আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতি টন ৩৫৩ দশমিক ১১ ডলার দরে মোট ৫০ হাজার টন চাল আমদানির চুক্তির অংশ হিসেবে এই চালানটি সরবরাহ করেছিল সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল'। চুক্তি অনুযায়ী, গত ২১ জুলাই প্রায় ১০ হাজার ৮৭৮ টন চাল নিয়ে 'এমভি এইচটি পাইওনিয়ার' নামক জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়।
পরদিন খাদ্য কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে চালের নমুনা সংগ্রহ করে গবেষণাগারে পাঠানো হয়। প্রাথমিক পরীক্ষায় চাল খাওয়ার উপযোগী বলে ছাড়পত্র পাওয়ার পর তা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুরের সরকারি গুদামগুলোতে পাঠানো হয়।
তবে পরবর্তীতে গুদাম ও খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা চালের একাংশের মান নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁদের অভিযোগ, চাল অত্যন্ত নিম্নমানের এবং খাওয়ার প্রায় অনুপযোগী। এই নিম্নমানের কারণে বন্দর থেকেই প্রায় ১ হাজার ৩৭৮ টন চাল জাহাজে ফেরত পাঠানো হয় এবং বাকি ৯ হাজার ৫০০ টন চাল গ্রহণ করা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল হালিশহর ও দেওয়ানহাট সিএসডি থেকে চালের নমুনা সংগ্রহ করে। পরীক্ষায় হালিশহর এবং ঢাকার একটি সরকারি গুদামের চালে আফলাটক্সিনের উপস্থিতি ধরা পড়ে।
ব্রির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. কাজী শিরীন আক্তার জাহান গণমাধ্যমকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত চালে আফলাটক্সিন তৈরি হতে পারে। নমুনায় যা শনাক্ত হয়েছে, তার মাত্রা বর্তমানে সহনীয় পর্যায়েই রয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে জানান, এই মাত্রা সহনীয় সীমা অতিক্রম করলে তা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম জসিম উদ্দিন খান পরীক্ষা সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এই চালের বিতরণ অবিলম্বে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। হালিশহর সিএসডির ব্যবস্থাপক মাহমুদ হাসান ও চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগের চলাচল ও সংরক্ষণ নিয়ন্ত্রক রেজওয়ান সাকিব চাল বিতরণ বন্ধ থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এম জসিম উদ্দিন খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে চালে আফলাটক্সিন পাওয়ার দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রোকর্প ইন্টারন্যাশনাল। এক ইমেইল বার্তায় তারা জানিয়েছে, বাংলাদেশি খাদ্য কর্মকর্তা ও সরবরাহকারীর যৌথভাবে সংগৃহীত নমুনা ভারতের একটি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং তা চুক্তির সব শর্ত পূরণ করেছিল। ব্রিতে পরীক্ষা করা সিলগালা যৌথ নমুনায় কোনো আফলাটক্সিন পাওয়া যায়নি বলেও তাদের জানানো হয়েছে। মান রক্ষায় তারা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে এবং বিতরণ স্থগিত করার আগে এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পায়নি বলে দাবি করে তারা।
প্রতিষ্ঠানটির শিপিং এজেন্ট 'সেভেন সিজ শিপিং লাইন'-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী আকবর অভিযোগ করেন, একটি স্বার্থান্বেষী মহল আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই সরবরাহকারীর সুনাম ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতি চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক কোনো সরবরাহকারী বাংলাদেশে খাদ্যশস্য সরবরাহে আগ্রহ দেখাবে না, যা দেশকে বড় বিপাকে ফেলতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষের এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে বড় ধরনের ধোঁয়াশা ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রাথমিক নমুনাগুলো পুরো চালানের সঠিক প্রতিনিধিত্ব করেছিল কি না, তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। তাছাড়া চিহ্নিত চালের বিষয়ে শেষ পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বা অন্যান্য গুদামের চালে আরও পরীক্ষা চালানো হবে কি না, সে বিষয়েও এখনো স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।
Comments