সীমান্তের ওপার থেকে উৎসবের আঙিনায়...
এক বাংলাদেশি মুসলিমের চোখে কলকাতার পুজো
ধর্ম যার যার, উৎসবের আনন্দটা যে আসলে সবার—এই চিরন্তন সত্যটা শুধু মুখে শোনার চেয়ে বুকে জড়িয়ে উপলব্ধি করার সেরা জায়গা বোধহয় পূজার সময়ের কলকাতা। একজন বাংলাদেশি এবং জন্মসূত্রে মুসলিম হিসেবে, ছোটবেলা থেকেই টিভির পর্দা আর ওপার বাংলার বন্ধুদের মুখে কলকাতার দুর্গাপূজার গল্প শুনে বড় হয়েছি। কিন্তু এবার কাঁটাতারের সীমান্ত পেরিয়ে যখন সরাসরি উৎসবের এই মহাসমুদ্রে এসে দাঁড়ালাম, তখন মনে হলো—সংস্কৃতি আর আনন্দকে ভাগ করার মতো কোনো দেওয়াল আসলে মানুষ তৈরি করতে পারেনি।
আলোর চাদরে ঢাকা কলকাতা
আকাশযানটি যখন ধীরে ধীরে কলকাতার রানওয়ের দিকে নামছিল, জানলা দিয়ে বাইরে তাকাতেই বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক দোলা দিয়ে উঠল। মেঘের কোল ঘেঁষে নিচে তাকাতেই মনে হলো, একটা আস্ত আলোর মহাসমুদ্র যেন ডানা মেলে রয়েছে। আর সেই আলোকোজ্জ্বল বিন্দুর ভিড়ে, ওপর থেকেই স্পষ্ট চেনা যাচ্ছিল মণ্ডপে মণ্ডপে আলোর রোশনাইয়ে উদ্ভাসিত দশভুজা দুর্গা দেবীকে। আকাশ থেকে দেখেই বুঝে গিয়েছিলাম, উৎসবের তিলোত্তমা আমাকে স্বাগত জানাতে তৈরি।
প্লেন থেকে মাটিতে পা রাখার পর বুঝলাম, শহরটা আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতো নেই। মনে হচ্ছিল, পুরো কলকাতা যেন কোনো জাদুকরের ছোঁয়ায় এক বিশাল আর্ট গ্যালারিতে রূপ নিয়েছে। ফুটপাত থেকে বহুতল ভবন—সব জায়গায় চন্দননগরের টুনি লাইটের মায়াবী আলোয় মোড়ানো। উৎসবের সেই আলো শুধু চোখ ধাঁধায় না, মনের ভেতর এক ধরণের অদ্ভুত ভালোলাগা তৈরি করে। রাস্তায় মানুষের ঢল, নতুন জামাকাপড়ের গন্ধ, আর বাতাসে ঢাকের আওয়াজের সাথে শিউলি ফুলের সুবাস—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব আমেজ।
দক্ষিণ কলকাতার থিম বনাম রাজাবাজারের সম্প্রীতি
পূজা দেখার অভিজ্ঞতাকে আমি মূলত দুটি ভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথমত, দক্ষিণ কলকাতার (South Kolkata) জাঁকজমক। সুরুচি সংঘ, চেতলা অগ্রণী কিংবা একডালিয়া এভারগ্রীনের মতো মণ্ডপগুলোর শিল্পকলা ও সৃজনশীলতা দেখে আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম। এক একটি প্যান্ডেল যেন একেকটি স্থাপত্যের বিস্ময়! লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ে লাইনে দাঁড়িয়ে যখন প্রতিমার সামনে পৌঁছালাম, তখন মনে হলো এই অপরূপ শিল্প সৃষ্টিকে উপভোগ করার জন্য কোনো ধর্মীয় পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না।
আমার সফরের সবচেয়ে সুন্দর এবং স্পর্শকাতর অভিজ্ঞতাটি হলো রাজাবাজারের পূজা। কলকাতার এই মুসলিম প্রধান এলাকাটিতে যখন পা রাখলাম, তখন এক অদ্ভুত সম্প্রীতির কোলাজ চোখের সামনে ভেসে উঠল। একদিকে মসজিদের মিনার, অন্যদিকে তারই গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা পূজা মণ্ডপ। আজানের সময় মণ্ডপের মাইক আর ঢাকের আওয়াজ বন্ধ রাখা, আবার পূজা কমিটির মুসলিম যুবকদের মণ্ডপ পাহারা দেওয়া বা দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানো—এই দৃশ্যগুলো আমার মনের সমস্ত সংশয় ধুয়ে মুছে সাফ করে দিল। ধর্ম যে মানুষকে দূরে ঠেলে না, বরং মেলবন্ধন ঘটায়, তার জীবন্ত প্রমাণ রাজাবাজার।
উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যের স্পর্শ: হাতিবাগান নবীন পল্লী
রাজাবাজারের এই অনন্য মানবিক অভিজ্ঞতা মনের কোণে জমিয়ে রেখে আমি পৌঁছেছিলাম উত্তর কলকাতার বিখ্যাত হাতিবাগান নবীন পল্লী-র মণ্ডপে। সেখানে পা রাখতেই যেন স্মৃতির কোনো টাইম মেশিনে চড়ে কয়েক দশক পিছিয়ে গেলাম। পুরো মণ্ডপটিকে সাজানো হয়েছিল কলকাতার ঐতিহ্যবাহী থিয়েটার বা নাট্যপাড়ার আদলে, যার থিম ছিল "শারদনাট্যোৎসব"।
ওপার বাংলার প্রতি এপার বাংলার বুকভরা ভালোবাসা
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি মুসলিম হিসেবে মনে একটা সুপ্ত ভয় বা দ্বিধা হয়তো অবচেতনে ছিল—পূজার এই আমেজে পরদেশী বা ভিনধর্মী হিসেবে আমাকে কীভাবে গ্রহণ করবে কলকাতার মানুষ?
কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ছিল ঠিক তার উল্টো। যখনই কোনো মণ্ডপের বাইরে, ফুচকার দোকানে বা ট্যাক্সিতে কথায় কথায় প্রকাশ পেয়েছে আমি "বাংলাদেশ থেকে এসেছি", তখনই মানুষের চোখের চাহনি আর গলার স্বর বদলে গেছে।
"আরে ওপার বাংলা থেকে এসেছেন! তা পুজো কেমন দেখছেন আমাদের এখানে?"—এই একটি বাক্যে যে পরিমাণ ওম আর আন্তরিকতা ছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। অনেক মণ্ডপের স্বেচ্ছাসেবকরা আমার পরিচয় জেনে ভিড় ঠেলে সামনে গিয়ে প্রতিমা দেখার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। দোকানে কেনাকাটা করতে গেলে বা স্ট্রিট ফুড খাওয়ার সময় বাড়তি খাতির পেয়েছি। এই ভালোবাসার কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই, কোনো ধর্মীয় ভেদাভেদ নেই। আমার মুখের ঢাকাইয়া বা বাংলাদেশি বাংলা ভাষাটাই এখানে আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়পত্র হয়ে উঠেছিল।
এক অনন্য আত্মিক অনুভূতি
পূজার দিনগুলোয় কলকাতায় কোনো বিভাজন দেখা যায় না। একজন মুসলিম হয়েও মণ্ডপে দাঁড়িয়ে যখন অঞ্জলি বা আরতির ঢাকের আওয়াজ শুনছিলাম, কিংবা বিজয়া দশমীর সিঁদুর খেলার আনন্দ দেখছিলাম, তখন নিজেকে কোনোভাবেই বহিরাগত মনে হয়নি। আনন্দ প্রকাশের ভাষা তো একটাই, আর তা হলো মানুষের হাসি।
পদ্মাপাড়ের মানুষ আমি, গঙ্গাপাড়ের এই উৎসবের আলো আমার চোখে ও মনে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিল। ভিসা-পাসপোর্টের নিয়ম মেনে আমি হয়তো আমার দেশে ফিরে যাব, কিন্তু কলকাতার মানুষের এই আন্তরিকতা, রাজাবাজারের সম্প্রীতির শিক্ষা আর উৎসবের এই রঙিন স্মৃতিগুলো সারাজীবনের জন্য আমার হৃদয়ে জমা হয়ে থাকবে। কাঁটাতার শুধু মানচিত্রকে ভাগ করতে পারে, মানুষের উৎসবপ্রিয় মন আর ভালোবাসাকে নয়—কলকাতার পুজো আমাকে এটাই শিখিয়ে গেল।
Comments