আস্থা সংকটে ইসলামি ব্যাংক, আমানত- বিনিয়োগ ও সম্পদ বৃদ্ধিতে পিছিয়ে
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর একসময় উল্লেখযোগ্য অবস্থান থাকলেও বর্তমানে এ খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। আর্থিক অস্থিতিশীলতা,ঋণ কেলেঙ্কারি, সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে গ্রাহকদের আস্থায় যে সংকট তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়ছে ব্যাংকগুলোর ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিতে। আমানত, বিনিয়োগ ও সম্পদ-তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকেই প্রচলিত ব্যাংকের তুলনায় পিছিয়ে পড়া সেই সংকটেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে ইসলামি ব্যাংকগুলোর আমানত এক বছরে মাত্র ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়েছে। বিপরীতে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে ১৪ দশমিক ১৩ শতাংশ। একইভাবে ইসলামি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ, যেখানে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর হার ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ। সম্পদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও ইসলামি ব্যাংকগুলো পিছিয়ে রয়েছে। অর্থাৎ শুধু আমানত সংগ্রহ নয়, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও সামগ্রিক ব্যবসা বৃদ্ধিতেও এ খাত তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে রয়েছে।
ব্যাংকিং ব্যবসার মূল ভিত্তি হলো গ্রাহকের আস্থা। আমানতকারীরা যখন কোনো ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবস্থাপনা ও অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন,তখন স্বাভাবিকভাবেই সেখানে নতুন আমানত রাখার আগ্রহ কমে যায়। ইসলামি ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অনিয়ম, ঋণ কেলেঙ্কারি এবং দুর্বল পরিচালনব্যবস্থা এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন।
বিশেষ করে ২০২১ সাল থেকে আগ্রাসী ঋণ বিতরণ এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য প্রকাশ্যে আসায় এ খাতের ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ২০২২ সালে দুটি ইসলামি ব্যাংকে বড় ধরনের অনিয়মের ঘটনা সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়। কয়েকটি ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষক নিয়োগ এবং ২০২৫ সালের আগস্টের পর সংকটের বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ্যে আসার ঘটনাও গ্রাহকের মনোভাবকে প্রভাবিত করেছে।
তবে আস্থার এই সংকটকে কেবল আমানত বৃদ্ধির নিম্নহার দিয়ে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়। ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য, খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং আমানতকারীদের অর্থ ফেরত পাওয়ার সক্ষমতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া গ্রাহকের আস্থা টেকসইভাবে ফিরিয়ে আনা কঠিন।
ইসলামি ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ এক বছরে ৫ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বিনিয়োগের পরিমাণ বেড়েছে, কিন্তু প্রবৃদ্ধির হার প্রচলিত ব্যাংকগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এ থেকে বোঝা যায়, ইসলামি ব্যাংকগুলো পুরোপুরি সংকুচিত হয়ে পড়েনি; বরং তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণের গতি তুলনামূলক ধীর হয়েছে।
তবে ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। বিনিয়োগের অর্থ কতটা উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে, ঋণগ্রহীতারা সময়মতো অর্থ ফেরত দিচ্ছেন কি না এবং বিনিয়োগ থেকে পর্যাপ্ত আয় হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে আগ্রাসী ঋণ বিতরণের সঙ্গে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসায় ভবিষ্যতে শুধু বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিবর্তে ঋণের মান ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ইসলামি ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যসংক্রান্ত সূচকেও ভিন্নধর্মী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০২৬ সালের আগস্টে রপ্তানি আয়-সংক্রান্ত প্রাপ্তি আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৪ শতাংশ কমে ৭৩৬ মিলিয়ন ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে রেমিট্যান্স বেড়েছে ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ। একই সময়ে আমদানি ব্যয় মেটাতে অর্থ পরিশোধ বেড়েছে ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইসলামি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে চাপ ও সম্ভাবনা—দুই দিকই দেখা যায়। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও রপ্তানি আয়-সংক্রান্ত প্রাপ্তি কমে যাওয়া এবং আমদানি পরিশোধ বৃদ্ধির পেছনে কী কারণ রয়েছে, তা বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। শুধু একটি মাসের তথ্য দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা নির্ধারণ করা যায় না; তবে ধারাবাহিকভাবে এমন চিত্র দেখা গেলে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন হবে।
এক বছরে ইসলামি ব্যাংকগুলোর কর্মীসংখ্যা প্রায় ৬ শতাংশ কমে ৪৪ হাজার ৭৮২ জনে দাঁড়িয়েছে। কর্মীসংখ্যা হ্রাস ব্যয় নিয়ন্ত্রণ বা পুনর্গঠনের অংশ হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি শাখা পরিচালনা, গ্রাহকসেবা এবং কর্মীদের মনোবলের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
বিশেষ করে আর্থিক সংকটের সময়ে দক্ষ জনবল ধরে রাখা,অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বাড়ানো জরুরি। শুধু কর্মী কমিয়ে ব্যয় সাশ্রয় করলেই ব্যাংকের দক্ষতা বাড়বে-এমন নিশ্চয়তা নেই।
সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিতে পিছিয়ে থাকলেও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ইসলামি ব্যাংকগুলোর অবস্থান আশাব্যঞ্জক। এ খাতের মোট আমানতের ৪৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ ইসলামি ব্যাংকগুলোর দখলে। অর্থাৎ প্রচলিত ব্যাংকের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এজেন্ট ব্যাংকিং এখনো তাদের একটি শক্তিশালী ক্ষেত্র।
এই অবস্থান কাজে লাগিয়ে গ্রামাঞ্চল ও ব্যাংকিং সেবাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানো, সহজে টাকা জমা ও উত্তোলনের সুবিধা দেওয়া এবং ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণ করা সম্ভব। তবে এজেন্ট নেটওয়ার্কের বিস্তার তখনই দীর্ঘমেয়াদি সুফল দেবে, যখন সেবার মান, নিরাপত্তা এবং গ্রাহকের অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও উন্নত হবে।
ইসলামি ব্যাংকিং খাতের সংকট কাটাতে প্রথমেই প্রয়োজন সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং অনিয়মের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। ঋণ অনুমোদনে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব বন্ধ করা, বড় ঋণগ্রহীতাদের ওপর কার্যকর নজরদারি, খেলাপি ঋণ আদায়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ এবং ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছ প্রকাশ জরুরি। পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
একীভূতকরণ বা পুনর্গঠনও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, তবে কেবল ব্যাংক একত্র করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। দুর্বল সম্পদের মূল্যায়ন, মূলধনের ঘাটতি নিরূপণ, আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিংয়ের নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা তদারকির ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
ইসলামি ব্যাংকগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি কেবল ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার ঘটনা নয়; এটি গ্রাহকের আস্থা, সুশাসন ও ব্যাংক পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন তৈরি করেছে। আমানত, বিনিয়োগ ও সম্পদের প্রবৃদ্ধিতে পিছিয়ে পড়া সেই সমস্যার দৃশ্যমান প্রতিফলন। তবে এ খাতের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে শক্ত অবস্থান এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের ইতিবাচক প্রবণতা দেখায় যে সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দ্রুত প্রবৃদ্ধির প্রতিযোগিতায় নামা নয়, বরং আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, অনিয়মের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা তৈরি করা। কারণ ব্যাংকের প্রকৃত শক্তি শুধু তার সম্পদের পরিমাণে নয়, বরং সেই সম্পদের পেছনে থাকা মানুষের আস্থা ও অর্থের নিরাপত্তায়। এই আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারলেই ইসলামি ব্যাংকিং খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধির পথ আবার উন্মুক্ত হতে পারে।
Comments