সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এক মাস: সামনে জনবল ও শাখা পুনর্গঠনই বড় চ্যালেঞ্জ
আগস্টে একক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম শুরু করা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে শুরু করে। এই এক মাসে এখন পর্যন্ত আমানত উত্তোলনের চাপ সফলভাবে সামাল দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে একীভূত ব্যাংকটির সাফল্যের জন্য জনবল ও শাখা নেটওয়ার্ক যৌক্তিকীকরণ এবং ব্যয় কমানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কার্যক্রমের দক্ষতা বাড়ানো, ব্যয় কমানো, সুশাসন জোরদার এবং ঋণ আদায় ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক এবং ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একীভূতকরণের সম্ভাব্য সুফল পেতে নতুন ব্যাংকটিকে শাখা কমানো, পাঁচ ব্যাংকের সম্মিলিত জনবল পুনর্বিন্যাস, প্রযুক্তি ব্যবস্থার সমন্বয় এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমকে আরও সুসংগঠিত করতে হবে।
জনবল ও অবকাঠামোর পুনর্গঠন নতুন ব্যাংকের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে। সফল একীভূতকরণের অর্থ হবে—একটি অভিন্ন শাখা কৌশল, একটি জনবল কাঠামো, একটি প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম, একটি ঋণ সংস্কৃতি এবং একটি অভিন্ন সুশাসন কাঠামো। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকটিকে পাঁচটি পূর্ববর্তী প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় ও জটিলতার বড় অংশই বহন করতে হবে।
নতুন ব্যাংকটি প্রায় ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ৯৭৫টি এটিএম নিয়ে একটি বিশাল ভৌত নেটওয়ার্ক উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে।
যদিও আইনি মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা একীভূত করা হয়েছে, বাস্তবে একীভূত ব্যাংকের অবকাঠামো এখনো পাঁচটি পূর্ববর্তী ব্যাংকের সম্মিলিত নেটওয়ার্কের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। অনেক এলাকায় এসব ব্যাংকের সাবেক শাখা ও সেবা কেন্দ্রগুলো পরস্পরের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। অনির্দিষ্টকাল ধরে এসব ওভারল্যাপিং শাখা ও আউটলেট চালু রাখলে পরিচালন ব্যয় বেশি থাকবে।
তবে ইতিবাচক দিক হলো, এই বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক নতুন ব্যাংকটিকে তাৎক্ষণিকভাবে দেশব্যাপী উপস্থিতি দিয়েছে—যে নেটওয়ার্ক একটি নতুন ব্যাংকের গড়ে তুলতে বহু বছর সময় লাগত।
কিন্তু পাঁচটি ব্যাংক আলাদাভাবে যে দক্ষতায় পরিচালিত হতে পারেনি, সেই নেটওয়ার্ককে আরও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারলেই কেবল এই বড় আকারের নেটওয়ার্ক ব্যাংকটির জন্য সুবিধায় পরিণত হবে।
ব্যাংকগুলো সাধারণত ভবন মালিকদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে আবদ্ধ থাকে। ফলে কোনো শাখার ইজারা বাতিল করতে গেলে উচ্চ ব্যয় হতে পারে। একীভূত ব্যাংকের জন্য ব্যয় কমানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পাঁচটি দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক সংকট ও দায়ভারও নতুন ব্যাংককে উত্তরাধিকারসূত্রে নিতে হয়েছে। এসব ব্যয় কমাতে না পারলে একীভূতকরণের মাধ্যমে প্রত্যাশিত পরিচালন দক্ষতা অর্জন করা কঠিন হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ব্যাংকটি প্রায় ১৬ হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারী পেয়েছে। পাঁচটি পূর্ববর্তী ব্যাংকের প্রত্যেকটির নিজস্ব সাংগঠনিক কাঠামো, পদবিন্যাস, বেতন কাঠামো, কর্মপদ্ধতি এবং ব্যবস্থাপনা সংস্কৃতি ছিল। এগুলোকে একটি অভিন্ন কাঠামোর আওতায় আনতে রিপোর্টিং ব্যবস্থা, দায়িত্ব বণ্টন, বদলি, কর্মী মোতায়েন এবং একই ধরনের পদ বিলুপ্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
অন্যদিকে, কর্মীদের জন্য একীভূতকরণের অর্থ হলো—নতুন ব্যাংকটি অভিন্ন পরিচালন কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বিদ্যমান দায়িত্ব ও সাংগঠনিক কাঠামো পরিবর্তিত হতে পারে।
তবে চ্যালেঞ্জটি শুধু প্রশাসনিক পুনর্গঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রাহকসেবা যাতে ব্যাহত না হয় এবং অভিজ্ঞ কর্মীদের ধরে রাখা যায়, তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাংককে বিভিন্ন বিভাগের পুনরাবৃত্ত কার্যক্রমও বাদ দিতে হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক শাখা নেটওয়ার্ক যৌক্তিকীকরণ এবং কার্যক্রম একীভূত করার কাজ করছে। দ্রুত শাখা বন্ধ বা কর্মী ছাঁটাই করলে সেবা ব্যাহত হতে পারে এবং জনবল ব্যবস্থাপনায় সমস্যা তৈরি হতে পারে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার ব্যাংক রেজল্যুশন বিভাগের মাধ্যমে পুরো প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছে। এর মধ্যে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, শাখা ও ব্যবসায়িক ইউনিট একীভূতকরণ, ঋণ আদায় এবং প্রযুক্তি ব্যবস্থার সমন্বয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যে এমন একটি অভিন্ন ইন্টারফেস চালু করেছে, যার মাধ্যমে আমানতকারীরা পাঁচটি সাবেক ব্যাংকের শাখা থেকেই টাকা তুলতে পারছেন। তবে কোর ব্যাংকিং সিস্টেমের মতো মূল প্রযুক্তি অবকাঠামোর একীভূতকরণের কাজ এখনো চলছে।
চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। শাখা একীভূত করার ক্ষেত্রে অবস্থান, ব্যবসায়িক সম্ভাবনা, গ্রাহকসেবা এবং পরিচালন ব্যয় বিবেচনা করা হচ্ছে।
একীভূত ব্যাংকটি তাৎক্ষণিক আমানত উত্তোলনের চাপও সামাল দিতে পেরেছে। শুরুতে যেসব আমানতকারী টাকা তোলার জন্য আবেদন করেছিলেন, তাদের অনেকেই এখনো টাকা তুলে নেননি।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১,৭৯,৬৮২ জন গ্রাহক মোট ৬,৯৭৫ কোটি টাকা উত্তোলনের আবেদন করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে ৯০,০৯৮ জন গ্রাহক ৩,২৪৫ কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন। একই সময়ে ব্যাংকটি ২,৭০০ কোটি টাকার নতুন আমানত পেয়েছে। ৩২ হাজারের বেশি নতুন হিসাব খোলা হয়েছে, যার মাধ্যমে আরও ৩৭৮ কোটি টাকা আমানত এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক উত্তোলনের চাহিদা পূরণে ৫,০০০ কোটি টাকা দেওয়ার পর ৭ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন ব্যাংকটি আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া শুরু করে। আবেদনের তুলনায় কম পরিমাণ অর্থ উত্তোলন হওয়ায় ব্যাংকটি সাময়িক স্বস্তি পেয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে গ্রাহকদের আস্থা পুরোপুরি ফিরে এসেছে। গ্রাহকদের আস্থা নির্ভর করবে নতুন ব্যাংক নিয়মিত অর্থ পরিশোধ করতে পারছে কি না, আর্থিক তথ্য স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করছে কি না এবং শাখা ও জনবল পুনর্গঠনের কাজ সুশৃঙ্খলভাবে করতে পারছে কি না—তার ওপর।
সরকার ২০,০০০ কোটি টাকা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৫,০০০ কোটি টাকা মূলধন সহায়তা দিয়েছে। ফলে নতুন ব্যাংকটি ৩৫,০০০ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধন নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে। এই বড় অঙ্কের মূলধন ব্যাংকটিকে একটি উল্লেখযোগ্য সুরক্ষা-কুশন দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে এটি নতুন প্রতিষ্ঠানের ওপর একটি কার্যকর ও টেকসই ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তোলার চাপও বাড়িয়েছে, যাতে শুধু পূর্ববর্তী ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম অব্যাহত রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত পাঁচটি ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১.৬৬ লাখ কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণ করা মোট ঋণের ৮৪.২২ শতাংশ। খেলাপি ঋণ আদায়ে একীভূত ব্যাংক ইতিমধ্যে হাজার হাজার মামলা করেছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি সমঝোতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি এবং অন্যান্য ঋণ আদায় পদ্ধতিও অনুসরণ করছে। ফলে নতুন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কার্যত একই সময়ে দুটি বড় পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মুখোমুখি—একদিকে পাঁচটি ব্যাংকের পরিচালন কাঠামোকে একীভূত করা, অন্যদিকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া দুর্বল ব্যালান্সশিট পুনর্গঠন ও আর্থিক অবস্থার উন্নতি করা।
Comments