সরকারের ২০ উদ্যোগের ৭টি বাস্তবায়ন, পাইপলাইনে ১৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ
দেশে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারের নেওয়া ২০টি বিশেষ উদ্যোগের মধ্যে সাতটি ইতোমধ্যে বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ ও খাত থেকে প্রায় ১৩০ কোটি মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য বিনিয়োগের পাইপলাইন তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা বাস্তবায়নের কাছাকাছি রয়েছে।
চলতি বছরের ১৬ মার্চ বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, ব্যবসায়ীদের সেবা সহজ করা এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে ২০টি উদ্যোগ ঘোষণা করে ইনভেস্ট বাংলাদেশ। উদ্যোগগুলোকে মূলত অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ সহায়তা এবং বিনিয়োগ সম্প্রসারণ—এই তিনটি ক্ষেত্রে ভাগ করা হয়েছে।
বন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে অগ্রগতি
বাস্তবায়িত উদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম চট্টগ্রাম বন্দরের লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল। প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলারের প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে টার্মিনালটির নির্মাণ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। চালু হলে এটি বন্দরের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পাশাপাশি ৭০০-এর বেশি সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে।
চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজও এগিয়ে যাচ্ছে। চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্প ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। সেখানে এক লাখের বেশি মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে। এ প্রকল্পকে ঘিরে প্রায় ১৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পাইপলাইন তৈরি হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ইতোমধ্যে সক্রিয়।
চট্টগ্রাম বন্দরে ২৪ ঘণ্টা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগও কার্যকর হয়েছে। এখন কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও ব্যাংকিং সেবাও সার্বক্ষণিকভাবে পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। এতে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের ছাড়করণ দ্রুত হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের সময় ও খরচ কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
এক প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগসেবা
বিনিয়োগকারীদের জন্য বিভিন্ন সরকারি সেবা সহজ করতে বিডা, বেজা ও পিপিপিএর বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমকে সমন্বিত করে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় বিনিয়োগকারীকে জমি, অর্থনৈতিক অঞ্চল, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমন্বিত সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) সম্পন্ন হওয়াকেও বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক পণ্য দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীদের ৭৫ শতাংশ সমস্যায় অগ্রগতি
বিনিয়োগ পরিবেশের প্রতিবন্ধকতা দূর করতে সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নিয়মিত সংলাপের ব্যবস্থাও চালু হয়েছে। প্রথম দুই দফা আলোচনায় ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা ২৮টি সমস্যা তুলে ধরেন। এর মধ্যে ২১টি বিষয়ে ইতোমধ্যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৭৫ শতাংশ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে এফডিআই প্রণোদনা কর্মসূচিও অনুমোদন করা হয়েছে। যোগ্য ব্যক্তি বিদেশি বিনিয়োগ দেশে আনতে পারলে বিনিয়োগের ইক্যুইটির ১ দশমিক ২৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রণোদনা পাওয়ার সুযোগ থাকবে। কর্মসূচির নির্দেশিকা অনুমোদনের পর এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির কাজ চলছে। আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে এটি চালুর লক্ষ্য রয়েছে।
বাকি উদ্যোগগুলোও এগোচ্ছে
২০টি উদ্যোগের মধ্যে এখনো বাস্তবায়নাধীন রয়েছে আরও ১৩টি। এসবের মধ্যে রয়েছে নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল, মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চল, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, পিপিপি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, তৃতীয় ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল, বাংলাবিজ প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণ এবং চীনের গুয়াংজুতে ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডকে যুক্ত করার উদ্যোগও এগিয়েছে। পিপিপি কাঠামোয় এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বন্দরের ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
অন্যদিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল ২০২৬ সালের মধ্যে চালুর লক্ষ্য রয়েছে। এটি চালু হলে বিমানবন্দরের বার্ষিক কার্গো ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা প্রায় ২ লাখ টন থেকে বেড়ে ৫ লাখ টনে উন্নীত হওয়ার কথা রয়েছে। এতে কয়েক হাজার নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
১৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ সম্ভাবনা
নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে বিভিন্ন দেশ ও খাতে। সম্ভাব্য ১৩০ কোটি ডলারের বিনিয়োগের মধ্যে চীন থেকে প্রায় ৬০ কোটি, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩০ কোটি, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০ কোটি এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রায় ১০ কোটি ডলার আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
খাতভিত্তিকভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে প্রায় ৩০ কোটি ডলার করে বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবা ও বস্ত্র খাতেও প্রায় ২০ কোটি ডলার করে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।
বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র চিহ্নিত করতে তৈরি করা হয়েছে এফডিআই হিটম্যাপ। এতে উন্নতমানের বস্ত্র, ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, আইটি সেবা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অটোমোটিভ যন্ত্রাংশ, হালকা প্রকৌশল, জুতা ও চামড়াজাত পণ্যকে দ্রুত বিনিয়োগের উপযোগী খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
দ্রুত সেবায় নতুন প্যাকেজ
বিনিয়োগকারীদের দ্রুত সেবা দিতে বাংলাবিজের আওতায় তিন দিনের 'বিজনেস স্টার্টার প্যাকেজ' চালুর প্রস্তুতি চলছে। পাশাপাশি ১৪ দিনের 'বিজনেস রেডিনেস প্যাকেজ' তৈরির কাজও চলছে। এর উদ্দেশ্য হলো বিনিয়োগের শুরু থেকে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সরকারি সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা।
এ ছাড়া পাঁচটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকা ১০ হাজার একরের বেশি শিল্প জমিতে ৪৪টি বিনিয়োগ সুযোগ নিয়ে একটি পোর্টফোলিও তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চীনে বিনিয়োগ প্রচার বাড়াতে গুয়াংজুতেও ইনভেস্ট বাংলাদেশের কার্যালয় স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বিচ্ছিন্ন সরকারি সেবা, অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত প্রকল্পের সংকট কমানো। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ আরও সহজ, প্রতিযোগিতামূলক ও পূর্বানুমানযোগ্য হবে।
Comments