সর্বজনীন পেনশনে বড় পরিবর্তন, শরিয়াহভিত্তিক স্কিমের অনুমোদন
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় পেনশনার মারা গেলে তাঁর স্বামী বা স্ত্রী ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন পাওয়ার সুযোগ পাবেন। আগে এই সুবিধার বয়সসীমা ছিল ৭৫ বছর। একই সঙ্গে সর্বজনীন পেনশনে শরিয়াহভিত্তিক বা ইসলামিক স্কিম চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভা শেষে সাংবাদিকদের বিষয়টি জানান কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান।
স্পাউসের পেনশন ৮০ বছর পর্যন্ত
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো পেনশনার মারা গেলে তাঁর স্বামী বা স্ত্রী ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন পাবেন। আগে এই সুবিধা ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিল।
ড. মো. সুরাতুজ্জামান জানান, পেনশনার নিজে আজীবন পেনশন পাবেন। আর তাঁর মৃত্যুর পর সাধারণভাবে স্বামী বা স্ত্রীকে স্পাউস হিসেবে বিবেচনা করে ৮০ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন দেওয়া হবে।
অনুমোদন পেল ইসলামিক স্কিম
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় শরিয়াহভিত্তিক একটি পৃথক স্কিম চালুর অনুমোদনও দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফলে প্রচলিত ব্যবস্থার পাশাপাশি ইসলামিক পদ্ধতিতে পেনশনে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরির কাজ শুরু হবে।
নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, ইসলামিক ভার্সন অনুমোদিত হলেও এটি চালুর আগে এর কাঠামো ও পরিচালন পদ্ধতি চূড়ান্ত করতে হবে। এ বিষয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও স্থানীয় পরামর্শকেরা কাজ করছেন। একচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করার পর বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে।
৫৫ বছর বয়সে পেনশনের সিদ্ধান্ত হয়নি
পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করার প্রস্তাব নিয়ে সভায় আলোচনা হলেও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে আপাতত ৬০ বছর বয়সেই পেনশন পাওয়ার বর্তমান নিয়ম বহাল থাকছে।
ড. সুরাতুজ্জামান বলেন, ৫৫ বছর বয়সে পেনশন দেওয়ার বিষয়টি পরবর্তী সময়ে একচুয়ারিয়াল সায়েন্সে নিয়োগ পাওয়া বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করে আবার গভর্নিং বডির সভায় তোলা হতে পারে।
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পেনশন শুরুর বয়স ৬২, ৬৬ বা ৬৭ বছর। পাশাপাশি বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ুও ক্রমেই বাড়ছে।
বিনিয়োগে ১১.৭২ শতাংশের বেশি মুনাফা
২০২৫-২৬ অর্থবছরে সর্বজনীন পেনশন কর্তৃপক্ষের তহবিল বিনিয়োগ করে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশের বেশি মুনাফা অর্জিত হয়েছে। পরিচালনা পর্ষদের সভায় এই মুনাফা অনুমোদন করা হয়।
তবে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পেনশনভোগীদের মুনাফা দেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তহবিলের পরিমাণ আরও বাড়লে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান নির্বাহী চেয়ারম্যান।
নিবন্ধনে প্রণোদনা বাড়ানো হয়েছে
সর্বজনীন পেনশনে নতুন সদস্য বাড়াতে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে প্রণোদনা বাড়ানো হয়েছে। এখন ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার (ইউডিসি), মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নতুন একজন সদস্য নিবন্ধন করালে ২৫ টাকা করে পাবে। আগে এ হার ছিল ১৫ টাকা।
কর্তৃপক্ষের আশা, প্রণোদনা বাড়ানোর ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বজনীন পেনশনে আরও বেশি মানুষকে যুক্ত করতে সক্রিয় হবে।
সরকারি কোম্পানির কর্মীদের 'প্রগতি' স্কিমে আনার উদ্যোগ
ডাক বিভাগ ছাড়া যেসব সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা বর্তমানে কোনো পেনশন ব্যবস্থার আওতায় নেই, তাদের 'প্রগতি' স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে বিদেশগামী কর্মীদের 'প্রবাস' স্কিমে যুক্ত করতে বিদেশ যাওয়ার আগে ডিপার্চার ওরিয়েন্টেশনের সময় তাদের এ বিষয়ে অবহিত করা হবে। এ সময় কর্মীদের লিফলেট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রে 'প্রবাস' স্কিমে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও সভায় আলোচনা হয়েছে।
ঋণ ও স্বাস্থ্যবীমা নিয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি
সর্বজনীন পেনশন তহবিল থেকে ঋণ দেওয়ার বিষয়েও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ঋণ দিলে কাঙ্ক্ষিত রিটার্ন বজায় রাখা সম্ভব হবে কি না, সুদের হার এবং অন্যান্য শর্ত পর্যালোচনা করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
পেনশন ব্যবস্থার আওতায় স্বাস্থ্যবীমা চালুর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এখনই স্বাস্থ্যবীমা চালু করা হচ্ছে না। একচুয়ারিয়াল বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্ভাব্য আর্থিক চাপ ও ঝুঁকি যাচাইয়ের পর এ বিষয়ে মডেল চূড়ান্ত করা হবে।
সরকারি অডিটের পাশাপাশি বেসরকারি সিএ ফার্ম
আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়াতে সরকারি অডিটের পাশাপাশি একটি বেসরকারি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) ফার্ম দিয়ে অডিট করানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, সরকারি নিয়মে নিয়মিত অডিটের পাশাপাশি নির্বাচিত একটি বেসরকারি সিএ ফার্ম আর্থিক কার্যক্রম পর্যালোচনা করবে। এতে কর্তৃপক্ষের হিসাব ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
Comments