নেপাল-তিব্বতে প্রাণঘাতী বন্যা: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেই এই বিপর্যয়
নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে সৃষ্টি হওয়া প্রাণঘাতী বন্যার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে বলে এক নতুন গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, হিমবাহের ক্ষয়, পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়া এবং ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতা মিলেই এই ভয়ংকর দুর্যোগের পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।
বিশ্বখ্যাত গবেষণা সংস্থা 'ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন' (ডব্লিউডব্লিউএ)-এর এই গবেষণায় বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন এককভাবে এই দুর্যোগের কারণ না হলেও এটি আগে থেকেই থাকা ভূতাত্ত্বিক দুর্বলতাকে আরও তীব্র ও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ওই অঞ্চলে চলতি বছরের জুলাই ও আগস্ট মাসে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। এই অতিরিক্ত উষ্ণতা হিমবাহ ও পারমাফ্রস্টের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। এছাড়া এ অঞ্চলের হিমবাহগুলো প্রতিবছর প্রায় আধা মিটার করে পাতলা হচ্ছিল, যা পাহাড়ি ঢালের অস্থিতিশীলতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
গবেষণাটির সহলেখক ও লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ুবিদ ড. ফ্রিডেরিকে অটো স্পষ্ট জানিয়েছেন, মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন এই দুর্যোগের পটভূমি তৈরি করে দিয়েছে—এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।
গবেষকদের মতে, জলবায়ুগত কারণের পাশাপাশি এর পেছনে ভূতাত্ত্বিক কারণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ২০১৫ সালে নেপালে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৮ মাত্রার প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প ওই এলাকার শিলাস্তরকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করে দিয়েছিল। উট্রেখট বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্বত জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও গবেষক ড. ওয়াল্টার ইমারজেল জানান, ২০১৫ সালের সেই ভূমিকম্পের পর পাহাড়ি ঢালটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আরও বেশি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
প্রাথমিক বিশ্লেষণে জানা যায়, নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতের কাছে হিমবাহের বিশাল একটি অংশ ধসে পড়ার পর বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ তীব্র গতিতে নিচে নেমে আসে। এর আঘাত এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, মার্কিন ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ সংস্থা (ইউএসজিএস)-এ তা ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূকম্পন হিসেবে ধরা পড়েছিল। মূলত ভূমিকম্পের কারণে এটি ঘটেনি, বরং হিমবাহ ধসের প্রচণ্ড অভিঘাত থেকেই ওই কম্পন অনুভূত হয়েছিল।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তে আঘাত হানা এই প্রবল বন্যা ও ভূমিধসে বহু ঘরবাড়ি ভেসে যায় এবং সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নেপাল সরকার এই দুর্যোগে নিখোঁজ ব্যক্তির সংখ্যা সংশোধন করে ৬ হাজার ১৫০ জনে দাঁড় করিয়েছে। এছাড়া এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৪০৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধারকাজে বেগ পেতে হচ্ছে এবং সুড়ঙ্গে আটকে রয়েছেন আরও কয়েকশ মানুষ।
উষ্ণ হয়ে ওঠা হিমালয়ে হিমবাহ ও পাহাড়ি ঢালের এই পরিবর্তন ভবিষ্যতের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনছে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে পাহাড়ি পরিবেশের পরিবর্তন আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
Comments