মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি ‘সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে’: জাতিসংঘ
সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার ৯ বছর পর জীবনযাত্রার মানের অবনতির প্রতিবাদ এবং নিরাপদে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীরা।
মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি বর্তমানে এক নতুন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। দেশটির রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর ক্রমবর্ধমান নির্মম নির্যাতন এবং দুর্লভ খনিজের অবৈধ খননসহ বিভিন্ন অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভয়াবহ প্রভাবের কথা তুলে ধরেছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার প্রকাশিত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা সামরিক বাহিনী নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও বৈধতা প্রতিষ্ঠার যে চেষ্টা চালাচ্ছে, তাতে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
প্রতিবেদনে তুলে ধরা তথ্য অনুযায়ী বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট:
-
নিহত বেসামরিক নাগরিক: ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে আনুমানিক ৮,০৭৫ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১,০৭৪ জন শিশু। উন্মুক্ত সূত্রের হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা ১৫,৭৩১ পর্যন্ত হতে পারে। গত এক বছরেই নিহত হয়েছেন অন্তত ১,২৪১ থেকে ৩,১০২ জন।
-
বাস্তুচ্যুতি ও খাদ্যসংকট: সহিংসতার কারণে দেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ লাখে। প্রায় ১ কোটি ২৪ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে এবং ৪ লাখ শিশু ও মা তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছেন।
পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এবং শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি—উভয় পক্ষই প্রধানত মুসলিম রোহিঙ্গা সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক ও পদ্ধতিগত মানবাধিকার লঙ্ঘন চালিয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গারা যখন জোরপূর্বক নিয়োগ থেকে পালানোর চেষ্টা করেন, তখন তাদের আটক করে অকথ্য নির্যাতন, হাত-পায়ের নখ তুলে ফেলা এবং যৌনাঙ্গে মরিচ লাগানোর মতো নৃশংসতা চালানো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
মিয়ানমারে আইনের শাসনের অনুপস্থিতিতে দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে অবৈধ অর্থনীতি। উত্তরাঞ্চলীয় কাচিন এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শান রাজ্যে দুর্লভ খনিজের অবৈধ খনন আন্তদেশীয় অপরাধী চক্রকে শক্তিশালী করছে। উপগ্রহচিত্র অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর কেবল কাচিন রাজ্যেই ৩০২টি নতুন খননস্থল গড়ে উঠেছে (১৪৯ শতাংশ বৃদ্ধি)। এই খননকাজের বর্জ্য ও দূষিত পদার্থ পরিবেশের পাশাপাশি মাতৃস্বাস্থ্য ও প্রজননস্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে; গর্ভপাত ও গর্ভাবস্থার জটিলতার হারও তীব্রভাবে বেড়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার টুর্ক এই পরিস্থিতিকে "হৃদয়বিদারক" ও গভীরভাবে উদ্বেগজনক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সব রাষ্ট্র, কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীকে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা এবং কর্মকাণ্ড গভীরভাবে আত্মসমালোচনা করে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।
Comments