রুফটপ সোলারে পোশাক খাতের ১৪% বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণ সম্ভব
দেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে রুফটপ সোলারের ব্যবহার বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতাও কমানো সম্ভব। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে পোশাক খাতের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৪ শতাংশ পূরণ করা সম্ভব।
সিপিডির হিসাবে, এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রায় ১৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার বা প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। তবে এ খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ঋণের সুদের হারকে বড় বাধা হিসেবে দেখছে প্রতিষ্ঠানটি। সাড়ে ৬ শতাংশ সুদে অর্থায়নের সুযোগ পাওয়া গেলে প্রায় ১ হাজার ৩০০ পোশাক কারখানা রুফটপ সোলারে যেতে আগ্রহী হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে সিপিডি আয়োজিত 'পোশাক কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা' শীর্ষক সেমিনারে গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
গবেষণায় দেশের ৩ হাজার ৩২০টি পোশাক কারখানার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫০টি কারখানায় সরাসরি জরিপ পরিচালনা করা হয়।
গবেষণা অনুযায়ী, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের ৮৭৮টি পোশাক কারখানার মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের মাত্র ৩ শতাংশ বর্তমানে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসছে। তবে এসব কারখানায় রুফটপ সোলারের ব্যবহার বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে পূরণ করা সম্ভব।
তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল খাতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাব্য সক্ষমতা প্রায় ২ হাজার ৮১৫ মেগাওয়াট। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আনুমানিক ১২ হাজার ৬৬৯ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে ৩০০ কিলোওয়াট বা তার বেশি ক্ষমতার ২ হাজার ৩০৩টি নন-অ্যাডাপ্টার কারখানায় সৌর প্যানেল স্থাপনের সুযোগ রয়েছে।
সিপিডির গবেষণায় আরও বলা হয়, রুফটপ সোলার থেকে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনে গড় খরচ প্রায় ৩ টাকা ৪ পয়সা। জাতীয় গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ কেনার তুলনায় এই ব্যয় অর্ধেকেরও কম।
তবে অর্থায়নের শর্ত অনুকূল না হলে এ খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সিপিডির মতে, বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার সাড়ে ১০ শতাংশের বেশি হলে শিল্পকারখানায় রুফটপ সোলার প্রকল্প ব্যাংকের দৃষ্টিতে আকর্ষণীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয় না। এজন্য সবুজ অর্থায়ন ও কম সুদের ঋণ সুবিধা অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সেমিনারে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, শিল্পকারখানাগুলোতে অনেক আগেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে বর্তমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় চাপ আরও কমানো সম্ভব হতো। পোশাক খাত ধীরে ধীরে রুফটপ সোলারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা ইতিবাচক পরিবর্তন।
তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে একদিকে শিল্পের জ্বালানি ব্যয়ের চাপ কমবে, অন্যদিকে কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য অর্জনেও সহায়তা করবে।
সিপিডির গবেষণা অনুযায়ী, পোশাক খাতে প্রায় ৯৭ লাখ বর্গমিটার ছাদ রয়েছে, যেখানে সৌর প্যানেল স্থাপনের সুযোগ রয়েছে। এসব ছাদ ব্যবহার করে প্রায় ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, রুফটপ সোলারে যেতে খুব বড় ধরনের বিনিয়োগ বা অতিরিক্ত সম্পদের প্রয়োজন নেই। প্রায় ১৮৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমেই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।
তিনি জানান, সব কারখানা এখনই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। প্রায় ৫০০টি কারখানা তাৎক্ষণিকভাবে বিনিয়োগ করতে পারে। আরও প্রায় ১ হাজার ৩০০ কারখানা প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে রুফটপ সোলারে যেতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে ৪০০টির বেশি কারখানার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নীতিগত ও কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন।
সেমিনারে হা-মীম গ্রুপের পাওয়ার অ্যান্ড এনার্জি বিভাগের প্রধান তনুল চক্রবর্তী জানান, তাদের প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে ২৯ দশমিক ২ মেগাওয়াট রুফটপ সোলার স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১৫ শতাংশ এবং সামগ্রিক জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬ শতাংশ পূরণ করা যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কান্ট্রি লিয়াজোঁ নুসরাত জাহান, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা ও অপারেশন) স্বপন বণিক, বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জাহিদুল আলম এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক মিনহাজুল হক উপস্থিত ছিলেন।
Comments