হরমুজ প্রণালি যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড করার হুমকি ট্রাম্পের
ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার কথা বলেছেন তিনি।
ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরানের ওপর বড় ধরনের অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছিলেন, আগামী সপ্তাহে তেহরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
নিউইয়র্কের একটি পুলিশ একাডেমিতে রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময়ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে মন্তব্য করেন ট্রাম্প। হাস্যরসের ভঙ্গিতে তিনি বলেন, খুব শিগগিরই তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। তবে তিনি কথাটি কতটা গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, তা স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরান জানিয়েছে, হুমকি কিংবা সামরিক শক্তি প্রদর্শন করে তেহরানকে ভয় দেখানো যাবে না। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, হরমুজ প্রণালি খোলা বা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত ইরানের নিজস্ব এখতিয়ার। কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য, সামরিক শক্তি কিংবা যুদ্ধজাহাজ দিয়ে এই জলপথ দখল করা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার মাত্র দুটি জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করেছে। এর আগের দিন সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুটি জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে, যার জন্য ইরানকে দায়ী করেছে আবুধাবি।
যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন গড়ে ১৩০টিরও বেশি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বাধা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।
হরমুজ সংকটের মধ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯০ ডলারে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও গ্যাসোলিনের দাম গ্যালনপ্রতি প্রায় ৪ ডলারে পৌঁছেছে। ট্রাম্প মার্কিন নাগরিকদের কিছুটা বেশি দামে জ্বালানি কেনার মানসিক প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার দাবি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে এই মূল্য দিতে হচ্ছে।
তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এর আগে বলেছিলেন, পারমাণবিক ইরান ঠেকানোর পাশাপাশি মার্কিন নাগরিকদের জন্য জ্বালানির দাম কম রাখাও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে মোতায়েন করা মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টিও উঠে এসেছে। প্রায় নয় মাস ধরে সমুদ্রে থাকা রণতরীটির নাবিকদের পরিবার তাদের দীর্ঘ সময়ের মোতায়েন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তবে ট্রাম্প এসব আশঙ্কাকে গুরুত্ব না দিয়ে বলেছেন, রণতরীটির মোতায়েনের সময়কাল তার কাছে অস্বাভাবিক দীর্ঘ নয়।
তবে শিগগিরই ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের পরিবর্তে একই ধরনের আরেকটি যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে রণতরীটির কয়েকজন নাবিকের আত্মহত্যার চেষ্টা এবং মানসিক অবসাদের বিষয়টি উঠে আসে। মার্কিন নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী হাং কাও কয়েকজন নাবিককে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত চিকিৎসা দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও বিষয়টি নিয়ে নেতিবাচক প্রচারের জন্য সংবাদমাধ্যমকে দায়ী করেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত বন্ধে গত জুনে হওয়া চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর এখনো নতুন করে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান চলছে। তবে এটিকে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি আলোচনা বলা যাচ্ছে না।
চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর থেকেই ইরান তাদের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করা জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ফের হামলা শুরু করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
Comments