হরমুজ প্রণালির রাজনৈতিক ‘কৃষ্ণ গহ্বর’
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতি,তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে সংশয় এবং অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার বিভাজন দেশটিকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে ঠেলে দিচ্ছে-যার প্রভাব চীন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ছে। বেইজিং কী করবে?
ইরানের সরকারি ও সরকারপন্থী গণমাধ্যম দাবি করেছে,ইরান-ওমানের যে সম্ভাব্য চুক্তি সামনে এসেছে,তার মাধ্যমে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পারবে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনেকেই মনে করেন,এমন কোনো চুক্তি যদি ইরানকে প্রণালিটির ওপর নিয়ন্ত্রণ দেয়,তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্র ও বৈশ্বিক বাণিজ্যিক স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হবে।
আন্তর্জাতিকভাবে ইরানের এই নিয়ন্ত্রণ স্বীকৃতি পেলে তা তেহরানকে একটি কৌশলগত হাতিয়ার দেবে-ভবিষ্যতের রাজনৈতিক বিরোধের সময় হরমুজ প্রণালিকে চাপ প্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ।
যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এই স্বীকৃতি ঠেকাতে চাইবে। এটি বৈশ্বিক পর্যায়ে মার্কিন স্বার্থের জন্য একটি বড় ধাক্কা হতে পারে-বিশেষ করে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে চীনের সঙ্গে জটিল আলোচনার সময়।
কিন্তু ইরানের আপাত রাজনৈতিক বিজয়ের আড়ালে হয়তো শাসনব্যবস্থার আরও গভীর একটি রূপান্তর ঘটছে-যা দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে পড়া এবং সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলার ইঙ্গিত দিতে পারে।
৫ আগস্ট চীনের সরকারি বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানায়,ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেছেন,সম্প্রতি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মাধ্যমে কি বেইজিংও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ করতেই তাদের সমস্যা হচ্ছে? আর পেজেশকিয়ানই বা এমন কথা বললেন কেন?
গত সপ্তাহে উপসাগরীয় দেশগুলো-যেগুলো এখন তেহরানের হামলার মুখে রয়েছে এবং চীনের অধিকাংশ তেল সরবরাহ করে-বেইজিংকে ইরানের ওপর হস্তক্ষেপ করে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার আহ্বান জানায়। কিন্তু কোনো ফল পাওয়া যায়নি। চীন হয়তো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ইরানে তাদের কথা বলার মতো কোনো পক্ষই নেই,আর সে কারণেই তারা উপসাগরীয় দেশগুলোকে সাহায্য করতে পারছে না।
ইরানি গণমাধ্যমের মতে,পেজেশকিয়ানকে "তেহরানের একটি গোপন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং কালো,কাচ-ঢাকা গাড়িতে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়,যাকে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।"
মোজতবা খামেনি নিজের জীবন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন কি না,এমনকি নিজের দেশের নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে আছে কি না-তাও স্পষ্ট নয়। ইরানের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে আসা এসব প্রতিবেদন স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয় যে দেশটির নেতৃত্ব তীব্রভাবে বিভক্ত। এর মধ্যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডসের (আইআরজিসি) সবচেয়ে কট্টরপন্থী অংশ মোজতবাকে একটি প্রতীকী বা পুতুল নেতা হিসেবে ব্যবহার করে চূড়ান্ত ক্ষমতা দখল করেছে-এমন সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে।
কিন্তু এর ফলে মোজতবা এবং রেভল্যুশনারি গার্ডস উভয়েই আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে,যা দেশের ভেতরে নতুন ও অস্থিতিশীল রাজনৈতিক গতিশীলতার সূচনা করতে পারে।
এর পাশাপাশি,যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য 'ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক' বা শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে হামলা ঠেকাতে ইরানের সামরিক কমান্ড কাঠামো স্থানীয় পর্যায়ে বিকেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে এই কাঠামো আবার কেন্দ্রীভূত করা হবে-এমন সম্ভাবনা কম। ইসরায়েলের তেহরানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে, যারা অভ্যুত্থান ঘটাতে পারে-এমন গুঞ্জনও রয়েছে।
এই গুঞ্জন হয়তো এমন এক সর্বব্যাপী পারস্পরিক সন্দেহের পরিবেশ তৈরি করেছে,যেখানে যে কাউকে যেকোনো কারণে 'বিশ্বাসঘাতক' হিসেবে অভিযুক্ত করা সম্ভব।
এসব পরিস্থিতি একটি স্পষ্ট ও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বজায় রাখা অসম্ভব করে তুলছে। কোনো ধরনের সমঝোতা হলে কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো সেটি ভেটো করতে পারে এবং সেটিকে 'বিশ্বাসঘাতকের আত্মসমর্পণ' বলে প্রত্যাখ্যান করতে পারে। আর সর্বোচ্চ নেতা রয়ে গেছেন এক অদৃশ্য ব্যক্তিত্ব-যাকে নিয়ন্ত্রণ করছে আরও কিছু অদৃশ্য ক্ষমতাকেন্দ্র।
তারপরও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে এবং দেশটির হাতে দৃশ্যত পর্যাপ্ত মজুতও রয়েছে।
সব মিলিয়ে এটি এমন এক দেশের চিত্র তুলে ধরে,যেখানে গভীর ভাঙন ও বিশৃঙ্খলা চলছে এবং যা ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। কিন্তু একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রও টিকে থাকতে পারে এবং বিপজ্জনক অবস্থায় থাকতে পারে। মিয়ানমার বহু বছর ধরে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মধ্যে রয়েছে,কোনো পক্ষেরই স্পষ্ট বিজয় আসেনি;তবুও দেশটির সামরিক জান্তা এখনো চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
একটি দুর্বল হয়ে পড়া ইরান মধ্য এশিয়া থেকে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত এক বিশাল অস্থিতিশীলতার অঞ্চল তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত ইরানের এই জটিল সংকটে সরাসরি জড়িয়ে পড়া এড়িয়ে চলেছে।
কিন্তু ইরানের অভ্যন্তরীণ ভাঙন-যদিও দেশটি বাস্তবে,আইনি স্বীকৃতির অর্থে নয়,হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে-আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহের জন্য ভিন্ন ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে।
মোজতবা খামেনির সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা এবং হরমুজ নিয়ে পিছু হটার বিনিময়ে তাঁর ও ইরানের অন্যান্য শীর্ষ নেতার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে সহায়তা করতে পারে।
ইতিবাচক দিক হলো,ইরানের এই ব্যর্থতা প্রথমবারের মতো এমন কিছু আঞ্চলিক রাষ্ট্রকে একত্রিত করছে,যারা আগে ইরান ও তার হুমকি মোকাবিলার পদ্ধতি নিয়ে বিভক্ত ছিল। এখন তারা তেহরানের ক্ষতিকর প্রভাব সীমিত করার বিভিন্ন ধারণায় একমত হচ্ছে এবং ইরানি শাসনব্যবস্থার ওপর মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে নতুন চাপ তৈরি করছে।
এই পরিস্থিতিতে অঞ্চলটি হরমুজ প্রণালিকে পাশ কাটিয়ে তেল ও বাণিজ্য পরিবহনের পথ তৈরির প্রচেষ্টা আরও জোরদার করবে। শেষ পর্যন্ত প্রণালিটি হয়তো ইরানের বাণিজ্যকেই বেশি সীমাবদ্ধ করবে এবং দেশটির ধর্মীয় নেতৃত্বকে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলবে।
এই পরিস্থিতিতে বেইজিং হয়তো আমেরিকার এই বিপর্যয়কে স্বাগত জানাতে পারে। কিন্তু হস্তক্ষেপ ও মধ্যস্থতা করতে না পারায় চীন এই অঞ্চলের রাজনৈতিক গতিশীলতার বাইরে চলে যাচ্ছে—যে গতিশীলতা ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের সঙ্গে অভিন্ন ভিত্তি খুঁজে পাওয়া চীনের জন্য কঠিন হতে পারে,কারণ বেইজিং হয়তো এমন সহযোগিতায় স্পষ্ট কোনো লাভ দেখতে পাচ্ছে না।
তবে চীনের সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় একটি রাজনৈতিক 'ব্ল্যাক হোল'-এর বিস্তার শিগগিরই বেইজিংয়ের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইরানের এই বিপর্যয় ঘটছে এমন এক সময়ে, যখন রাশিয়াও ইউক্রেনে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সংগ্রাম করছে। ফলে চীন খুব শিগগিরই নিজেকে একাধিক অস্থিতিশীল অঞ্চলে ঘেরা অবস্থায় দেখতে পারে-এমন পরিস্থিতি যা বেইজিং অবশ্যই ঠেকাতে চাইতে পারে।
-এশিয়া টাইমস থেকে
Comments