তেল বিক্রি ছাড়াই হরমুজ থেকে যেভাবে বছরে ১৪০ বিলিয়ন ডলার আয়
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় চালু করতে ইরান ও ওমান একটি রূপরেখা বাস্তবায়নের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। এই চুক্তির মাধ্যমে বিশ্বে জ্বালানি পরিবহনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের ওপর তেহরানের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তেহরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের যুদ্ধ প্রায় 'শেষের পথে'। তিনি বলেছেন, 'যুদ্ধ খুব শিগগিরই শেষ হতে চলেছে। ইরান আর বেশিদিন এভাবে চালিয়ে যেতে পারবে না।' স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি থেকে ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য পরিবাহিত হতো। পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসও (এলএনজি) এই পথে পরিবাহিত হতো।
ওমানের সঙ্গে চুক্তি হলেই যে হরমুজে নৌযান চলাচল আগের পর্যায়ে ফিরে যাবে, সে বিষয়ে কোনও নিশ্চয়তা নেই বলে জানিয়েছেন ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদী। গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিতে পুনরায় অবাধ নৌ-চলাচল শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রকে বেশকিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শর্তপূরণ করতে হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে তারা।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, এই প্রণালি ব্যবহারকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর পণ্যের মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ ট্রানজিট বা সার্ভিস ফি হিসেবে আদায় করতে চাইছে তেহরান।
অন্যদিকে মালাক্কা প্রণালির মডেলে 'ভলান্টারি ফি' রাখার প্রস্তাব দিয়েছে ওমান। এটি বাধ্যতামূলক টোলের পরিবর্তে নেভিগেশন, পরিবেশগত এবং উদ্ধারকাজ সংক্রান্ত সেবার জন্য অনুদান হিসেবে বিবেচিত হবে।
আরব আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্য গালফ নিউজ একটি হিসাবের মাধ্যমে দেখিয়েছে, যদি ওমান-ইরান চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি খুলে যায় এবং এতে চলাচলে ইরানের শর্ত অনুযায়ী ৭ শতাংশ ফি আরোপ করা হয়–তাহলে ইরানের আয় প্রায় ১৪ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে, প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের পরিমাণ যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছাতে হবে।
গালফ নিউজ এক্ষেত্রে একটি বড় অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজকে (ভিএলসিসি) উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছে। এই ধরনের জাহাজগুলো প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল বহন করতে পারে। ব্যারেল প্রতি প্রায় ৮০ ডলার দাম ধরলে জাহাজের পণ্যের মোট মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১৬ কোটি ডলার। এর ওপর ৭ শতাংশ ফি ধার্য করলে শুধু ওই একটি জাহাজ থেকেই ইরানের কোষাগারে জমা হবে ১ কোটি ১০ লাখ থেকে ১ কোটি ১২ লাখ ডলার।
যদি ইরান প্রকৃত অর্থে ৭ শতাংশ ফি আদায়ে সমর্থ হয়, তাহলে অ্যালফাবেট, এনভিডিয়া, অ্যাপল, মাইক্রোসফট এবং সৌদি আরামকোর মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কর্পোরেশনগুলোর বার্ষিক নিট আয়কে টেক্কা দিতে পারবে।
তখন হরমুজের আয়ের সামনে সুয়েজ খালকেও নস্যি মনে হবে। ২০২৫/২০২৬ অর্থবছরে এই জলপথ থেকে ৪৬৭ কোটি ডলার আয়ের কথা জানিয়েছিল মিশরের সুয়েজ খা কর্তৃপক্ষ।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইরানের জিডিপি ছিল প্রায় ৩৬ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। হরমুজ থেকে বছরে ১৪ হাজার কোটি ডলার আয় হলে অতিরিক্ত তেল উৎপাদন ছাড়াই দেশটির জিডিপির আকার ৩৭ থেকে ৩৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে।
তবে এই লাভের পথ একেবারেই সহজ নয়। কারণ খরচ বা আইনি ঝুঁকি বাড়লে জাহাজ মালিক ও বিমাকারীরা এই প্রণালী এড়িয়ে চলতে পারে বা ছাড়ের দাবি জানাতে পারে। নৌ-চলাচল কমে গেলে ওমান ও অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগির পর আয়ের হার একেবারেই কমে যাবে।
আইনজ্ঞদের মতে, এই ফি প্রয়োগের ক্ষেত্রে তেহরানকে আন্তর্জাতিক আইনের বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে হবে। জাতিসংঘের সমুদ্র আইন সংক্রান্ত কনভেনশনের (ইউএনসিএলওএস) অধীনে আন্তর্জাতিক নৌচলাচলে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক প্রণালিসহ সব জলপথে জাহাজগুলোর 'ট্রানজিট প্যাসেজ'-এর অধিকার রয়েছে। সেই যাতায়াতে 'কোনও বাধা দেয়া যাবে না'।
উপকূলীয় দেশগুলো নৌচলাচল, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে তাদের নিয়মকানুন কোনো বিদেশি জাহাজের প্রতি বৈষম্য করতে পারে না বা ট্রানজিট প্যাসেজকে অস্বীকার, বাধাগ্রস্ত বা ক্ষুণ্ন করতে পারে না।
তবে ইউএনসিএলওএস-এর ২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ 'টেরিটোরিয়াল সি'-তে চার্জ আরোপের অনুমতি দেয়। তবে তা শুধুমাত্র নির্দিষ্ট পরিষেবার বিনিময়ে জাহাজগুলোর কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
তবে এই আইনি চিত্র আরও জটিল হয়ে উঠেছে কারণ ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই ইউএনসিএলওএস-এ অনুস্বাক্ষর করেনি। তাই ইরান ফি বসানোর ক্ষেত্রে এই কনভেনশনের বিধিনিষেধ মেনে চলবে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
Comments