দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে অনিরাপদ শহর ঢাকা। কেন বাড়ছে অপরাধ? সমাধান কী?
বিশ্বখ্যাত ডেটাবেস 'নামবিও'-এর অপরাধ ও নিরাপত্তা সূচক অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে অনিরাপদ শহরের তালিকায় শীর্ষস্থানে এসেছে ঢাকা। প্রায় ৬২.২ অপরাধ সূচক এবং ৩৭.৮ নিরাপত্তা সূচক নিয়ে শহরটি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বড় শহরের চেয়ে পিছিয়ে পড়েছে। ঢাকার একজন সাধারণ বাসিন্দার কাছে এই তথ্যটি নতুন কোনো বিস্ময় না হলেও, আন্তর্জাতিক পরিসরে এ ধরনের সূচক শহরের সামগ্রিক ভাবমূর্তি ও নাগরিক জীবনের বাস্তবতাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়।
এই তালিকার পেছনের মূল কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঢাকার অপরাধ পরিস্থিতি কেবল কোনো পরিসংখ্যানগত বিষয় নয়, বরং তা দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সুরক্ষার সাথে সরাসরি জড়িত। রাস্তায় ছিনতাই, চুরি, কিশোর গ্যাংয়ের প্রভাব এবং রাতে একাকী চলাচলে নিরাপত্তাহীনতার বোধ নগরবাসীর নিত্যদিনের সঙ্গী। এর পাশাপাশি দুর্নীতি ও অপরাধের বিচারহীনতার সংস্কৃতি মানুষের মনে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। কেবল বড় ধরনের অপরাধই নয়, বরং গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনা এবং নারীদের চলাচলে অনিরাপত্তাও এই সামগ্রিক নেতিবাচক অভিজ্ঞতায় ভূমিকা রাখে।
যদিও নামবিও-এর এই তথ্যগুলো জনমত ও প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তৈরি, তবুও এটি শহরের বাস্তব জননিরাপত্তার প্রতিচ্ছবি হিসেবে কাজ করে। দক্ষিণ এশিয়ার দিল্লি বা করাচির মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর চেয়েও যখন ঢাকা অনিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত হয়, তখন তা নগর ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।
একটি মেগাসিটির উন্নয়ন কেবল দৃশ্যমান পরিকাঠামো যেমন মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা ফ্লাইওভার তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। নাগরিকদের জন্য রাতের বেলা নিরাপদে হেঁটে বাড়ি ফেরার নিশ্চয়তা তৈরি করাই নগর নিরাপত্তার আসল পরিচয়। ঢাকাকে বাসযোগ্য ও নিরাপদ করতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো, পুলিশি টহল জোরদার করা এবং কার্যকর আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি।
ঢাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার টেকসই উন্নয়নে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শুধুমাত্র পুলিশি পদক্ষেপের ওপর নির্ভর না করে প্রশাসনিক, প্রযুক্তিগত এবং সামাজিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এই পরিস্থিতির সংস্কার করা সম্ভব।
১. আইনশৃঙ্খলা ও নজরদারি জোরদার
প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং: পুরো ঢাকা শহরকে পর্যায়ক্রমে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় নিয়ে আসা এবং অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে এআই-ভিত্তিক নাইট-ভিশন ক্যামেরা স্থাপন করা।
নিয়মিত নাইট টহল: বিশেষ করে অলিগলি, বাসস্ট্যান্ড, ট্রেন স্টেশন ও নির্জন এলাকাগুলোতে রাতের বেলা পুলিশ ও আনসার বাহিনীর টহল বহুগুণ বাড়ানো।
দ্রুত সাড়াদান: জরুরি নম্বর '৯৯৯'-এর সেবার পরিধি বাড়িয়ে যেকোনো অপরাধের খবরে ৫–১০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর মতো বিশেষ টহল (পেট্রোল) টিম গঠন করা।
২. বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করা
দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ: ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত রেখে দৃষ্টান্তমূলক ও দ্রুত শাস্তির ব্যবস্থা করা।
থানার সেবা সহজীকরণ: সাধারণ মানুষ যাতে কোনো ভয় ছাড়া জিডি বা মামলা করতে পারেন, সেজন্য থানাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা ও হয়রানি বন্ধ করা।
৩. নগর পরিকাঠামো ও সড়ক নিরাপত্তা
পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইট: শহরের প্রতিটি সড়ক, ফুটপাত ও অলিগলিতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা। অন্ধকার গলিগুলো অপরাধীদের মূল আশ্রয়স্থল।
গণপরিবহন ব্যবস্থার সংস্কার: বাসে সিসিটিভি বসানো, নিবন্ধিত (রেজিস্টার্ড) চালক-হেলপার নিশ্চিত করা এবং রাতে নারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য বিশেষ নজরদারি ও বাস স্টপগুলোতে আলোর ব্যবস্থা রাখা।
৪. সামাজিক ও কিশোর অপরাধ রোধ
কিশোর গ্যাং দমন ও পুনর্বাসন: কেবল গ্রেপ্তার নয়, সামাজিক সচেতনতা তৈরি এবং অপরাধে যুক্ত হওয়া কিশোরদের সংশোধনাগারে পাঠিয়ে ইতিবাচক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।
কমিউনিটি পুলিশিং: স্থানীয় বাসিন্দা ও ওয়ার্ডভিত্তিক কমিটির মাধ্যমে মহল্লার নিরাপত্তা নজরদারি ও নতুন ভাড়াটিয়া বা সন্দেহভাজনদের তথ্য সংগ্রহে সহযোগিতা করা।
Comments