ব্যাংক লুটপাট বন্ধ, রিজার্ভে স্বস্তি, বাজারে অস্বস্তি, বিনিয়োগে খরা
২০২৪ সালের এই দিনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। স্বজনসহ দলের প্রায় সব কেন্দ্রীয় নেতাসহ তাকে দেশ থেকে চলে যেতে হয়েছে।
এই দুই বছরের মধ্যে দেড় বছর কেটেছে অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এবং এ বছর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ক্ষমতায় আছে।
দেশের রাজনীতিতে এবং শিক্ষাসহ সব সামাজিক পরিসরে অনেক কিছু ঘটেছে এই সময়ে এবং ঘটে চলেছে। দেখা যাক অর্থনীতির পরিসরে কী ঘটেছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে। মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ ৩৬,৫৯২ দশমিক ৬৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩৬ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা বিপিএম৬ অনুযায়ী রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১,৭৭৬ দশমিক ২৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৩১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের সময় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ২৫.৯২ বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচলিত হিসাব অনুযায়ী) এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম৬ মানদণ্ড অনুযায়ী তা ছিল ২০.৪৮ বিলিয়ন ডলার। তাঁর দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে ২০২১ সালের আগস্টে রিজার্ভ সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়নে উঠেছিল।
গত দুই বছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করেছে—১. বৈদেশিক ঋণ বৃদ্ধি, ২. আমদানি হ্রাস এবং ৩. রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি।
ব্যাংক লুটপাট বন্ধ হয়েছে
শেখ হাসিনার পুরো শাসনামলে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ব্যাংক খাতে ব্যাপক লুটপাট। চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী এস আলম, জয়নুল হক সিকদার পরিবার, পি কে হালদারসহ বেশ কিছু মানুষের লুটপাট ও অনিয়মের শিকার হয়েছে অনেকগুলো ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রশ্রয় আর সহযোগিতায় এস আলমের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ছিল ৭টি ব্যাংক। এছাড়া লুটপাটে জড়িত ছিলেন এক্সিম ব্যাংকের নজরুল ইসলাম মজুমদার, কৃষকলীগ নেতা চৌধুরী নাফিস শরাফত, সাবেক আমла মহিউদ্দিন খান আলমগীর ও ব্যবসায়ী বাবুল চিশতি, আইএফআইসি ব্যাংকের সালমান এফ রহমান, ন্যাশনাল ব্যাংকের জয়নুল হক সিকদারের পুরো পরিবার এবং বেসিক ব্যাংকের আবদুল হাই বাচ্চু। এস আলম প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় সবচেয়ে বড় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশসহ এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান দখলে নিয়েছিলেন।
ক্ষমতার কেন্দ্রের নির্দেশে এদের সহযোগিতা করে গেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুই গভর্নর ফজলে কবীর ও আব্দুর রউফ তালুকদার। এর আগে অর্থনীতিবিদ আতিউর রহমান গভর্নর থাকাকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকার রিজার্ভ চুরি সেই আমলের এক বড় কেলেঙ্কারি। সরকারি ব্যাংকগুলোতেও রাজনৈতিক বিবেচনায় পরিচালক বসিয়ে লুটপাট সহজ করা হয়। সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারি, জনতা ব্যাংকের অ্যাননট্যাক্সের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া লিজিং অর্থাৎ নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ব্যাপক লুটের শিকার হয় পি কে হালদারসহ কিছু লোকের মারফতে। বলতে গেলে পুরো ব্যাংক ও আর্থিক খাতই হয়ে উঠেছিল লুটপাটের আখড়া।
শেখ হাসিনার সরকারের পতনে এই লুটপাতে রাশ টেনে ধরা সম্ভব হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বেশ কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপের কারণে এখন অনেকটাই শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে এই খাতে। তবে ক্ষত রয়ে গেছে।
রেমিট্যান্স প্রবাহ
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর প্রবাসীদের মধ্যে আস্থা বৃদ্ধি, হুন্ডি বা অবৈধ মাধ্যম ব্যাহত হওয়া এবং ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলারের দাম বাস্তবসম্মত ও একমুখী হওয়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রবাসীরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি সমর্থন এবং দেশ গড়ার তাগিদে বৈধ পথে অর্থ পাঠানো বাড়িয়ে দেন, যা এখনো অব্যাহত আছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে ৩.১৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে আসা ২.৫৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তুলনায় ২৩.৪ শতাংশ বেশি। তবে সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি ইউনূস সরকার। যার ধারাবাহিকতা এখনো চলছে।
আমদানি ও রপ্তানি
দুটিই কমেছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদাও কমেছে, যা রিজার্ভ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ব্যাপক ঋণ নিয়ে ব্যয় নির্বাহ করছে।
রাজস্ব খাত
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন আমল থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত রাজস্ব খাতে বড় ধরনের ঘাটতি ও শ্লথগতি দেখা গেছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনজনিত অস্থিরতা, সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট এবং শ্লথ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে রাজস্ব আয়ে এই ধারাবাহিক ব্যর্থতা ও চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সঞ্চয়পত্র থেকে অর্থ সংগ্রহ কমে যাওয়ায় সরকারকে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বেশি ঋণ নিতে হয়েছে।
বিনিয়োগে খরা
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বিনিয়োগের খরা চলছে। দেশীয় বিনিয়োগ যেমন কম, তেমনি কম বিদেশি বিনিয়োগও। বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের পতন এবং শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি স্পষ্টভাবেই বলছে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়নের চাকা স্থবির হয়ে পড়েছে। এমনকি 'ইজ অব ডুয়িং বিজনেস' সূচকে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম। বিনিয়োগের এই মন্দার পেছনে কাজ করছে অনিশ্চয়তা। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মব নামের উশৃঙ্খলাতায় ব্যবসা-বাণিজ্য একপ্রকার গতিহারা হয়ে পড়ে। এর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা—দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, ঋণের উচ্চ সুদহার, তীব্র জ্বালানি সংকট, ডলারের ঘাটতি এবং করের বোঝা—বিনিয়োগকারীদের আস্থা সম্পূর্ণরূপেই নড়বড়ে করে দিয়েছে। বর্তমানে যে তীব্র গ্যাস সংকট চলছে, তা আরও কমিয়ে দেবে বিনিয়োগ। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে, যা থেকে বোঝা যায় ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করছেন না।
জিডিপি
উৎপাদন খাতে উল্লেখযোগ্য ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। একসময় যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৬.৫ শতাংশের মধ্যে ছিল, সেখানে তা এখন ৩ থেকে ৩.৫ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এই হার আরও কমে ৩ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
মূল্যস্ফীতি
সাধারণ মানুষকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে নিত্যপণ্যের দাম। মূল্যস্ফীতি প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) আগের প্রান্তিকের তুলনায় দেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২১ শতাংশে। মূলত জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সবজির মূল্যবৃদ্ধি এ সময়ে মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির গতি কম হওয়ার কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
Comments