গুম-হত্যার আতঙ্ক: বেলুচিস্তানে থামছে না মানবাধিকার লংঘন
আবারও পাকিস্তানের বালুচিস্তানের প্রসঙ্গ। দেশটিতে অস্থিরতা লেগেই আছে আর পাকিস্তান বাহিনীর মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাও বাড়ছে। পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে দীর্ঘকাল ধরে জোরপূর্বক গুম,বিচারবহির্ভূত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে আসছে। এই অঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও আন্দোলন দমানোর মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে।
এ মাসের হিসেব এখনও আসেনি। তবে ২০২৬ সালের জুন মাসে বেলুচিস্তানে জোরপূর্বক গুম, হেফাজতে ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, এবং সমষ্টিগত শাস্তির ধারাবাহিক ব্যবহার অব্যাহত ছিল। মানবাধিকার কমিশন অব বেলুচিস্তান মাসটিতে জোরপূর্বক গুমের ৪৯টি এবং হত্যাকাণ্ডের ৭২টি ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। একই সঙ্গে, একাধিক সামরিক অভিযান ও নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপের ফলে বেসামরিক মানুষের সম্পত্তি ধ্বংস, চলাচলের ওপর দীর্ঘস্থায়ী বিধিনিষেধ, এবং সাধারণ নাগরিক ও মানবাধিকার রক্ষাকারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে। জোরপূর্বক গুমের ঘটনাগুলোর মধ্যে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু হওয়া গোষ্ঠীগুলোর অন্যতম ছিল। অন্যদিকে, পানজগুর ও খুজদার জেলায় অপহরণের সর্বোচ্চ সংখ্যা নথিভুক্ত হয়েছে।
সম্প্রতি প্রদেশটির ৮৫ শতাংশ নিজেদের দখলে আছে দাবি করে বালুচ আন্দোলনের নেতা মীর ইয়ার বেলুচ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বেলুচিস্তানকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানান। এর পর থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। কড়া সেসন্সরশিপ থাকায় পাকিস্তানের পত্র পত্রিকায় সেভাবে কোন খবর আসে না। তবে বেলুচিস্তান থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনগুলি আতঙ্কের এক দৃশ্য চিত্রিত করে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, দৈনন্দিন জীবনের নিয়মিত ছন্দ ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। বাজার থেকে পুরুষদের তুলে নেওয়া, রাস্তা থেকে ছাত্রদের টেনে নিয়ে যাওয়া, সরকারি অফিস থেকে শিক্ষকদের নিখোঁজ করা যেন সাধারণ ব্যাপার হয়ে পড়েছে। দ্যা বালুচিস্তান পোস্ট জানিয়েছে, গতকালও ৬ জনকে গুম করা হয়েছে কোয়েটা থেকে। এখনকার টার্গেট বেশি হচ্ছে ছাত্ররা। যাদের তুলে নেওয়া হচ্ছে তাদের বেশিরভাগই আর ফিরে আসছে না।
দীর্ঘদিন ধরে প্রদেশটিকে তাড়া করে আসা বলপূর্বক গুমের যে ঢেউ এখন তীব্রতর হচ্ছে তা কেবল নিরাপত্তা সংকট নয় বরং স্পষ্ট দৃষ্টিতে একটি গভীর মানবিক ট্র্যাজেডির উন্মোচনকে ইঙ্গিত করে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী,বেলুচিস্তানে গুমের ঘটনা ক্রমেই ঊর্ধ্বমুখী,যা স্থানীয় পরিবারগুলোতে তীব্র আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সরকারের তরফ থেকে উগ্রপন্থী দমনের নামে বিভিন্ন সামরিক অভিযান পরিচালনার ফলে বেসামরিক নাগরিকদের নির্বিচার আটক ও গুমের অভিযোগ তুলছেন অধিকারকর্মীরা। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য ও অধিকারকর্মীরা (যেমন বেলুচ ইয়েকজেহতি কমিটি) দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে আসলেও তাদের ওপর কঠোর দমনপীড়ন ও আইনি নিপীড়ন চালানো হচ্ছে।
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বেলুচিস্তান দেশটির বৃহত্তম (৪৪ শতাংশ এলাকা জুড়ে) অথচ সবচেয়ে কম জনবহুল একটি প্রদেশ, যা বিপুল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। এর ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো এবং ঐতিহাসিকভাবে এটি 'কালাত খানাত'সহ বিভিন্ন স্বাধীন অংশে বিভক্ত ছিল। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৮ সালে এই অঞ্চলটি পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর থেকেই কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার দাবিতে প্রদেশটিতে বেশ কয়েকবার রাজনৈতিক সংঘাত ও সশস্ত্র বিদ্রোহ দেখা দেয়।নিয়মিত নিপীড়নের মাধ্যমে, হত্যা আর খুনকে স্বাভাবিক করে এই প্রদেশ লুট করছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। পাকিস্তানের সঙ্গে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার লড়াই আজকের নয়। বহু বছর ধরে পাকিস্তানের নির্মম শাসন থেকে মুক্তি পেতে চাইছে বেলুচিস্তানের সাধারণ মানুষ।
বেলুচিস্তানের স্থানীয় সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক অধিকার হরণের পাশাপাশি পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। সন্দেহভাজন রাজনৈতিক কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং গুম করার ঘটনা বালোচদের ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। মেগা প্রজেক্টে স্থানীয়দের অবমূল্যায়ন চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC) এবং গোয়াদার বন্দর নির্মাণে স্থানীয়দের স্বার্থ সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। বেলুচদের আশঙ্কা, এসব প্রকল্পের ফলে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ঘটবে এবং তারা নিজেদের ভূমিতেই সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে।
Comments