ব্যাংকের টাকায় দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ফুর্তি !
দেশের ব্যাংকগুলো এখন চিকিৎসাধীন। কারও পুঁজিতে ঘাটতি, কারও তারল্যে সংকট, কারও গ্রাহক নিজের জমা টাকাই তুলতে পারেন না। ব্যাংকের সামনে মানুষের লাইন, উদ্বেগ আর ক্ষোভ—এটাই এখন বাস্তবতা। অথচ এই বাস্তবতার মাঝেই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাথায় এসেছে এক অভিনব চিন্তা—চলুন, উৎসব করি!
শুধু উৎসবই নয়, সেই উৎসবের বিলও দেবে ব্যাংকগুলো।
রাজধানীর ৪১৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি টাকা পর্যন্ত স্পন্সরশিপ চেয়েছে ডিএসসিসি। ভাষাটা অবশ্য ভদ্র-"স্পন্সরশিপ"। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অনুরোধ আর অনুরোধ থাকে কোথায়? সেটি অনেক সময় অলিখিত বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই টাকা কীসের জন্য?
জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য নয়।
ভাঙা রাস্তা মেরামতের জন্য নয়।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের জন্য নয়।
নাগরিক সেবার মান বাড়ানোর জন্যও নয়।
টাকা লাগবে কনসার্টের জন্য। শোভাযাত্রার জন্য। ম্যারাথনের জন্য। সাইক্লিং উৎসবের জন্য। মেলার জন্য। অর্থাৎ যে শহরে প্রতিদিন নাগরিকরা দুর্ভোগের ম্যারাথন দৌড়াচ্ছেন, সেই শহরের সরকারিভাবে আরেকটি ম্যারাথনের আয়োজন হবে!
ব্যাপারটা এমন, যেন একজন রোগী আইসিইউতে শুয়ে আছেন,আর তাঁর স্বজনেরা হাসপাতালের করিডোরে জন্মদিনের ডিজে পার্টির আয়োজন করছেন।
সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গটি অন্য জায়গায়।
যে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূচকে বিশ্বের সবচেয়ে কম বাসযোগ্য শহরগুলোর একটি, সেই ঢাকার "ঐতিহ্য" বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা হবে। প্রশ্ন হলো, কোন ঐতিহ্য?
বর্ষা এলেই হাঁটুসমান পানি?
ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট?
বিষাক্ত বাতাস?
নাকি এমন ফুটপাত, যেখানে হাঁটার চেয়ে বাধা অতিক্রমের দক্ষতা বেশি প্রয়োজন?
ঢাকার যদি কোনো আন্তর্জাতিক পরিচয় তৈরি হয়ে থাকে,সেটি দুর্ভোগের। সেই বাস্তবতা বদলানোর আগে ব্যানার, ফেস্টুন আর কনসার্ট দিয়ে শহরের ব্র্যান্ডিং করতে চাওয়া আসলে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই অভিনন্দন জানানোর মতো।
আর ব্যাংকগুলোর অবস্থার কথাও ভুলে গেলে চলবে না। বছরের পর বছর লুটপাট, খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাব আর দুর্বল নিয়ন্ত্রণে ব্যাংকিং খাতের যে অবস্থা হয়েছে, তা থেকে ঘুরে দাঁড়াতেই হিমশিম খাচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো। বহু আমানতকারী নিজের টাকা ফেরত পেতে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। সেই খাতের কাছেই এখন উৎসবের চাঁদা চাওয়া হচ্ছে।
এটাকে যদি করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা বলা হয়, তাহলে প্রশ্ন করতে হয়—সমাজের দায় কি কনসার্ট আয়োজন, নাকি মানুষের জীবনমান উন্নয়ন?
সিএসআরের টাকা দিয়ে হাসপাতাল হতে পারে, স্কুল হতে পারে, পার্ক হতে পারে, ডেঙ্গু প্রতিরোধ কর্মসূচি হতে পারে, খাল পুনরুদ্ধার হতে পারে। কিন্তু একটি সিটি করপোরেশন যদি সেই টাকায় নিজের জন্মদিন পালন করতে চায়, তাহলে সিএসআরের সংজ্ঞাটাই নতুন করে লিখতে হবে।
ঢাকার মানুষ আজ জন্মদিনের গান শুনতে চান না। তাঁরা চান বৃষ্টির পরে বাসায় ফিরতে হাঁটুসমান পানি না পেরোতে। তাঁরা চান অ্যাম্বুলেন্স যানজটে আটকে না থাকুক। তাঁরা চান পরিচ্ছন্ন বাতাস, নিরাপদ ফুটপাত, কার্যকর ড্রেনেজ আর জবাবদিহিমূলক নগর প্রশাসন।
একটি শহরকে ভালোবাসার সবচেয়ে বড় উপায় তার জন্মদিন পালন নয়; তাকে বাসযোগ্য করে তোলা। কিন্তু আমরা উল্টো পথে হাঁটছি। শহর অসুস্থ, তাই তার চিকিৎসা নয়—মেকআপের ব্যবস্থা হচ্ছে। দেয়ালে নতুন রং, মঞ্চে নতুন আলো, আর ব্যানারে নতুন স্লোগান। যেন সাজসজ্জা দিয়েই বাস্তবতা বদলে যাবে।
আসলে এই আয়োজন ঢাকার জন্মদিনের নয়, আমাদের প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের জন্মগত সমস্যার উদযাপন। যে শহরের নাগরিক প্রতিদিন দুর্ভোগে বাঁচে, সেই শহরের শাসকেরা যদি কোটি টাকার উৎসবকে জরুরি মনে করেন, তাহলে সমস্যাটা শুধু শহরের নয়; সমস্যাটা দৃষ্টিভঙ্গির।
ঢাকা দিবস অবশ্যই হোক। তবে তার আগে একটি "বাসযোগ্য ঢাকা দিবস" পালন করা যাক—যেদিন কোনো রাস্তায় জলাবদ্ধতা থাকবে না, যেদিন ফুটপাত দিয়ে মানুষ হাঁটতে পারবে, যেদিন নাগরিক সেবা নিয়ে গর্ব করা যাবে। সেই দিন কনসার্ট করলে কেউ আপত্তি করবে না।
তার আগে ব্যাংকের টাকায় উৎসব নয়-ব্যাংকের টাকায় যদি কিছু করতেই হয়, তবে ঢাকার ক্ষতগুলো সারানোর চেষ্টা হোক। কারণ অসুস্থ শহরের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন জন্মদিনের কেক নয়, চিকিৎসা।
Comments