ফুটবল যখন মেলানোর কথা,আমরা কেন তবে রক্তের দাগে বিভক্ত?
বলা হয়ে থাকে,ফুটবল বিশ্বকাপ নাকি সারা পৃথিবীর মানুষকে এক অদৃশ্য সুতোয় গেঁথে ফেলে। কিন্তু আমাদের প্রিয় বাংলাদেশে চিত্রটা যেন ঠিক উল্টো। বিশ্বকাপ এলেই এখানে আনন্দের বদলে শুরু হয় বিভাজন আর বিদ্বেষের উৎসব। মাঠে লড়ে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল,ইংল্যান্ড কিংবা পর্তুগাল; অন্যদিকে তার চেয়েও রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ শুরু হয় আমাদের নিজেদের চেনা আঙিনায়। কেউ আর্জেন্টিনার নীল-সাদা প্রেমে মগ্ন,কেউ ব্রাজিলের হলুদে বিভোর,কেউ বা অন্য কোনো দলের। সমর্থন থাকবে,পাগলামি থাকবে,চায়ের কাপে ঝড় তোলা তর্ক থাকবে-এসবই তো ফুটবলের চিরায়ত সৌন্দর্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো,সেই সুন্দরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আমাদের ভেতরের মানুষটি আজ কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে?
ফুটবলের শক্তি বনাম আমাদের বাস্তবতা
ফুটবল পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। এই খেলার মূল শক্তিই হলো এটি মানুষকে মেলাতে জানে। ভিন্ন ভাষা,ভিন্ন সংস্কৃতি,ভিন্ন ধর্ম কিংবা যোজন যোজন দূরত্বের মানুষও একই গোলপোস্টে আনন্দে বুকে বুক মেলায়। অথচ আমাদের দেশে বিশ্বকাপ এলেই সেই সম্প্রীতির আঙিনা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে,হিংসা আর সংঘর্ষের চারণভূমিতে।
সাম্প্রতিক বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে অন্তত ১৫টি তাজা প্রাণ ঝরে গেছে। এই সংখ্যাটি শুধু একটি নির্মম পরিসংখ্যান নয়;এটি আমাদের সামাজিক সহনশীলতার দেউলিয়াত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চরম অবক্ষয়ের এক করুণ আর্তনাদ।
একটি খেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের মৃত্যু,ভাইয়ের হাতে ভাইয়ের রক্তপাত কিংবা বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা সম্পর্ক চিরতরে ভেঙে যাওয়া-কোনো সুস্থ সমাজেই স্বাভাবিক হতে পারে না। একটি খেলা,তা যত বড়ই হোক না কেন,কখনোই একটি মানুষের মহামূল্যবান জীবন,একটি পবিত্র বন্ধুত্ব কিংবা একটি পরিবারের চিরায়ত ভালোবাসার চেয়ে বড় হতে পারে না।
যখন সম্পর্কগুলো জার্সিতে বদলে যায়
ফুটবলীয় 'বান্টার' বা খুনসুটি পৃথিবীর সব ফুটবল সংস্কৃতিরই আনন্দদায়ক অংশ। ম্যাচের আগে খোঁচা থাকবে,বাজি ধরা থাকবে,ট্রল থাকবে। কিন্তু রেফারির শেষ বাঁশির সাথে সাথেই তো সেসব মাঠে কিংবা ভার্চুয়াল জগতেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। আমাদের দেশে যেন উল্টো নিয়মে ঘড়ি চলে। বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু মানুষের মনের ভেতরের ক্ষোভ আর বিষবাষ্প রয়ে যায়। চেনা মানুষের জার্সি বদলে যায়,সেই সাথে আজীবনের সম্পর্কগুলোও ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। আমরা কি এতটাই অন্ধ হয়ে গেছি যে,খেলা আর শত্রুতার মধ্যকার সুক্ষ্ম রেখাটিই মুছে ফেলেছি?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো,আমাদের ঘরের নিষ্পাপ শিশুরাও এই বিষাক্ত পরিবেশ দেখছে। তারা বড়দের এই অন্ধ আক্রোশ দেখেই বড় হচ্ছে। তারা শিখছে-ভিন্ন দল মানেই অন্য গ্রহের মানুষ, ভিন্ন মত মানেই চিরশত্রু। আমরা কি সত্যিই আমাদের আগামী প্রজন্মকে এই ঘৃণার পাঠশালায় বড় করতে চাই? খেলা তো এক মাস পর শেষ হয়ে যায়, কিন্তু শিশুরা বড় হয় আমাদের রেখে যাওয়া আচরণের ক্ষত বুকে নিয়ে।
পরিচয় সংকটের গোলকধাঁধা
আমরা আরও একটি সরল সত্য প্রায়ই ভুলে যাই-এই টুর্নামেন্টে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ খেলছে না। সবুজ মাঠে আমাদের লাল-সবুজের পতাকা উড়ছে না,গ্যালারি কাঁপিয়ে আমাদের জাতীয় সংগীত বাজছে না। তবুও আমরা এমনভাবে একে অপরের বুকে ছুরি বসাতে যাই,যেন নিজেদের অস্তিত্বের যুদ্ধ চলছে। অথচ আমাদের প্রথম এবং শেষ পরিচয়-আমরা বাংলাদেশি।
যে আবেগ নিয়ে আমরা রাত জেগে চোখ লাল করি,যে উন্মাদনা নিয়ে নিজের পকেটের পয়সায় ভিনদেশের বিশাল পতাকা বানাই, সেই একই ভালোবাসার এক চিলতেও যদি আমরা দেশের ফুটবলের জন্য জমা রাখতাম! যদি আমরা সবাই মিলে দাবি তুলতাম—আমাদের দেশের ফুটবলকেও বিশ্বমানের করতে হবে যেমনটা হয়েছে ক্রিকেটে।
তাহলে হয়তো একদিন আমাদের সন্তানদের ভিনদেশের পতাকা বুকে জড়িয়ে কাঁদা-হাসা করতে হতো না। তারা নিজেরাই লাল-সবুজের পতাকা হাতে বিশ্বকাপের গ্যালারিতে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতো। সেদিন আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল কিংবা পর্তুগালের সমর্থকেরা গ্যালারিতে বসে একসঙ্গে বাংলাদেশের জন্য গলা ফাটাতো। সেটিই হতো আমাদের প্রকৃত অহংকার,আমাদের সবচেয়ে বড় জয়।
শেষ বাঁশির পর
বিশ্বকাপ আমাদের আনন্দ দিক,হৃদয়ে কাঁপন ধরানো উত্তেজনা দিক,আজীবন মনে রাখার মতো মুহূর্ত উপহার দিক। কিন্তু দয়া করে মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ আর সহনশীলতার জায়গাটি কেড়ে না নিক।
বিশ্বকাপ শেষ হবে। স্টেডিয়ামের আলো নিভে যাবে,ছাদ থেকে পতাকা নেমে যাবে,প্রিয় জার্সিটি আলমারির কোনো কোণে জবুথবু হয়ে পড়ে থাকবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের টাইমলাইনও একসময় শান্ত হবে। কিন্তু এই কয়েক সপ্তাহের উন্মাদনায় যদি একটি সাজানো সংসার ভেঙে যায়,একটি পরম বন্ধুত্ব হারিয়ে যায় কিংবা একটি মায়ের কোল খালি হয়-সেই অপূরণীয় ক্ষতি পৃথিবীর কোনো ট্রফি,কোনো মহাতারকার জাদু কিংবা কোনো বাঁধভাঙা উদ্যাপন কোনোদিনও পূরণ করতে পারবে না।
বিশ্বকাপ আবার চার বছর পর আসবে। নতুন কোনো নায়ক আসবে,নতুন কোনো দেশ চ্যাম্পিয়ন হবে। কিন্তু মানুষের মনে তৈরি হওয়া ক্ষত সহজে মুছে যায় না। তাই খেলা হোক মাঠের সবুজ ঘাসে,প্রতিদ্বন্দ্বিতা হোক নিখাদ আনন্দে,আর আমাদের আবেগটা বন্দি থাক মানবিকতার সুন্দর সীমানায়।
দিনের শেষে,বিশ্বকাপ যতই অনিন্দ্য সুন্দর হোক না কেন,আমাদের রক্ত আর মাটির টান তার চেয়েও কোটি গুণ বেশি সত্য। কারণ টুর্নামেন্ট শেষ হবে,কিন্তু আমরা বাংলাদেশের মানুষ এই এক টুকরো ভূখণ্ডেই একসঙ্গে বেঁচে থাকব। সেই পরিচয়ই সবার ওপরে। আর তাই,মাঠের লড়াই শেষে পারস্পরিক সৌহার্দ্য আর মানবিকতাই হোক আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যাম্পিয়নশিপ।
Comments