অং সান সু চি কি বেঁচে আছেন? জান্তা সরকারের গোপনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন
মিয়ানমারের ক্ষমতাচ্যুত ও কারাবন্দি গণতন্ত্রকামী নেত্রী অং সান সু চি জীবিত আছেন কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ২০২২ সালের শেষ দিকে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর থেকে ৮১ বছর বয়সী এই নেত্রীকে আর কখনোই জনসমক্ষে দেখা যায়নি। এমনকি তাঁর আইনজীবী, পরিবারের সদস্য বা কোনো বিদেশি কূটনীতিককেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
এই পরিস্থিতিতে সু চির যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ছেলে কিম অ্যারিস সম্প্রতি বিশ্বনেতাদের কাছে তাঁর মায়ের 'প্রুফ অব লাইফ' বা জীবিত থাকার প্রমাণ দাবি করার আহ্বান জানিয়েছেন। লন্ডনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "গত প্রায় চার বছর ধরে পরিবারের কেউ মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। আমার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—মা এখন কোথায় আছেন এবং তিনি আদৌ জীবিত আছেন কি না।"
চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মিয়ানমারের সামরিক সরকার দাবি করে যে, তীব্র গরমের কারণে সু চিকে কারাগার থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছে। তবে এরপরও কোনো বিদেশি কূটনীতিককে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। সামরিক সরকার কেবল জানাচ্ছে যে তিনি 'সুস্থ আছেন'। গত এপ্রিলে জান্তা সরকার সু চির একটি ছবি প্রকাশ করলেও সেটি কবেকার, তা পরিষ্কার নয়। কিম অ্যারিসের দাবি, ছবিটির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ আছে এবং সু চিকে যদি গৃহবন্দি করাও হয়ে থাকে, তবে সেটি তাঁর ইয়াঙ্গুনের পারিবারিক বাসভবনে নয়।
সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপ জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের কাছে সু চির শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চান। কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, সু চির নাম উঠতেই সেনাপ্রধান তীব্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখান।
জান্তা প্রধানের এমন আচরণে অনেক কূটনীতিকের মনে সংশয় জেগেছে যে, সামরিক সরকার হয়তো সু চির জীবিত থাকার প্রমাণ দিতেই অক্ষম। তবে লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ মরগান মাইকেলস মনে করেন, সু চির মৃত্যু বা গুরুতর অসুস্থতার খবর দীর্ঘদিন গোপন রাখা জান্তার পক্ষে কঠিন। মূলত সেনাপ্রধানের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক বিদ্বেষের কারণেই সু চিকে এভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে।
গত ১২ জুলাই ব্যাংককে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও সু চির বর্তমান অবস্থা নিয়ে জান্তা সরকারের কাছে জবাব চাওয়া হয়। বিশ্লেষকদের মতে, অন্তত বিদেশি কূটনীতিকদের তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দিলে আসিয়ান ও জাতিসংঘের সঙ্গে মিয়ানমারের কূটনৈতিক সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হতে পারত। উল্লেখ্য, ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারকে আসিয়ানের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকগুলো থেকে কার্যত বাদ রাখা হয়েছে।
সু চিকে মুক্তি দিলে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে: ১. সশস্ত্র প্রতিরোধে ফাটল: এক বিদেশি কূটনীতিকের মতে, সু চি মুক্ত হলে জান্তাবিরোধী লড়াইয়ে যুক্ত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর বর্তমান ঐক্যে ফাটল ধরতে পারে। ২. গণআন্দোলনের শঙ্কা: তবে মরগান মাইকেলস মনে করেন, জান্তা সরকার সশস্ত্র প্রতিরোধের চেয়ে সু চির নেতৃত্বে নতুন কোনো শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলন শুরু হওয়াকে বেশি ভয় পায়। কারণ, দীর্ঘ কারাবাস সত্ত্বেও মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ 'বামার' জনগোষ্ঠীর কাছে সু চির জনপ্রিয়তা এখনো আকাশচুম্বী।
মিয়ানমারের কারাগারগুলোতে মানবাধিকার সংকট
মানবাধিকার সংগঠন 'অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনার্স' (এএপিপি)-এর তথ্যমতে, মিয়ানমারের কারাগারগুলোতে বর্তমানে ১৪ হাজার ৫০০-এর বেশি রাজনৈতিক বন্দি চরম অমানবিক পরিস্থিতিতে দিন কাটাচ্ছেন। যথাযথ চিকিৎসা ও মৌলিক সুবিধার অভাবে চলতি বছরই কারাগারে অন্তত ৬০ জন রাজনৈতিক বন্দির মৃত্যু হয়েছে।
মায়ের সন্ধান চাওয়ার পাশাপাশি কিম অ্যারিস বিশ্ববাসীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, "আমি শুধু আমার মায়ের খবর জানতে চাই না; আমার মা নিজেও চাইতেন, মিয়ানমারের বাকি হাজারো রাজনৈতিক বন্দির দুর্দশার কথা যেন বিশ্ব ভুলে না যায়।"
Comments