বিশ্বের অন্যতম কম বাসযোগ্য শহর: কেন পিছিয়ে ঢাকা?
বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল মহানগরগুলোর একটি হলেও বাসযোগ্যতার দিক থেকে ঢাকা দীর্ঘদিন ধরেই পিছিয়ে রয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) প্রকাশিত গ্লোবাল লাইভেবিলিটি ইনডেক্স ২০২৬-এ বিশ্বের ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো এই অবস্থান ধরে রাখা উদ্বেগজনক। ঢাকার নিচে রয়েছে কেবল যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার দামেস্ক ও লিবিয়ার ত্রিপোলি। অর্থাৎ যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে ক্ষতিগ্রস্ত দুটি শহর বাদ দিলে বিশ্বের আর কোনো শহরই ঢাকার চেয়ে কম বাসযোগ্য নয়।
ইআইইউ পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকের ভিত্তিতে শহরের বাসযোগ্যতা নির্ধারণ করে—স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো। এই পাঁচটি ক্ষেত্রেই ঢাকার দুর্বলতা স্পষ্ট। ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে ঢাকার মোট স্কোর মাত্র ৪২, যেখানে এশিয়ার ৫৮টি শহরের গড় স্কোর প্রায় ৭৪। অর্থাৎ আঞ্চলিক গড়ের তুলনায় প্রায় ৩২ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী।
ঢাকার প্রধান সমস্যা হিসেবে প্রথমেই আসে ভয়াবহ যানজটের কথা। তবে সংকট শুধু যানজটেই সীমাবদ্ধ নয়। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অস্বাভাবিক জনঘনত্ব, দুর্বল গণপরিবহন ব্যবস্থা, খোলা জায়গার অভাব, বায়ু ও শব্দদূষণ, জলাবদ্ধতা এবং অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা-সব মিলিয়ে নাগরিক জীবন দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি হলেও সেই অনুপাতে নাগরিক সুবিধা ও অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়নি।
এই অবনতির জন্য এক বছরের ব্যর্থতাকে দায়ী করা যায় না। বরং বহু বছর ধরে পরিকল্পনার ঘাটতি, আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতা এবং নগর ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) এবং অন্যান্য নগর পরিকল্পনা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ ও নগর সম্প্রসারণ অব্যাহত রয়েছে। অনেক অবকাঠামো নির্মাণ হলেও সেগুলোর মান ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
বাসযোগ্য শহরের অন্যতম শর্ত হলো উন্নত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ গণপরিবহন ব্যবস্থা। কিন্তু ঢাকায় এখনও কার্যকর বাসভিত্তিক গণপরিবহন গড়ে ওঠেনি। বাসগুলোর মধ্যে যাত্রী তোলার প্রতিযোগিতা, অনিয়ম এবং বিশৃঙ্খলা নগর জীবনে দুর্ভোগ বাড়িয়ে তুলছে। ফলে অনেক মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে উৎসাহিত হচ্ছে, যা যানজটকে আরও তীব্র করছে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সমন্বিত সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
নগর পরিচালনায় জবাবদিহির অভাবও ঢাকার অন্যতম বড় সমস্যা। বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং দায়িত্ব পালনে দুর্বলতার কারণে নাগরিক সমস্যার কার্যকর সমাধান হচ্ছে না। পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা নিরসন কিংবা ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা-প্রায় সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের ঘাটতি স্পষ্ট।
দক্ষিণ এশিয়ার বড় শহরগুলোর মধ্যেও ঢাকার অবস্থান সবচেয়ে নিচের দিকে। পাকিস্তানের করাচি ঢাকার এক ধাপ ওপরে রয়েছে। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভও বাসযোগ্যতার দিক থেকে ঢাকার চেয়ে এগিয়ে। এটি প্রমাণ করে যে ঢাকার সংকটের মূল কারণ যুদ্ধ নয়, বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল নগর শাসন, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, পরিবেশ দূষণ এবং পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ।
ঢাকাকে বাসযোগ্য শহরে পরিণত করতে হলে শুধু নতুন সড়ক বা ভবন নির্মাণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সমন্বিত নগর পরিকল্পনা, আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নাগরিক সেবায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন। পাশাপাশি জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণ, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নেও গুরুত্ব দিতে হবে।
ঢাকা বাংলাদেশের অর্থনীতি, শিক্ষা ও প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু। তাই এই শহরের বাসযোগ্যতা উন্নত করা শুধু রাজধানীর জন্য নয়, পুরো দেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য। যথাযথ পরিকল্পনা, সুশাসন এবং কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে ভবিষ্যতে ঢাকার অবস্থানের উন্নতি সম্ভব। অন্যথায় বিশ্বের অন্যতম কম বাসযোগ্য শহরের এই অস্বস্তিকর পরিচয় আরও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।
Comments