সার্বভৌমত্বের প্রতীক কি হারিয়ে গেলো কূটনীতির কাছে?
বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ভবন কেবল একটি অনন্য স্থাপত্যশৈলীই নয়,এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব,গণতান্ত্রিক চেতনা এবং বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের সর্বোচ্চ প্রতীক। সম্প্রতি এই সংসদ ভবনে আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপনের ঘটনাটি দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। একটি স্বাধীন দেশের মূল আইনসভা প্রাঙ্গণকে অন্য কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের জাতীয় দিবস উদযাপনের ভেন্যু হিসেবে ব্যবহার করা কতটুকু যৌক্তিক,তা নিয়ে সাধারণ নাগরিক ও বিশ্লেষকদের মনে গভীর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার জন্য যেকোনো রাষ্ট্রই অন্য দেশের জাতীয় দিবসে শুভেচ্ছা জানায়,দূত পাঠায় কিংবা রাষ্ট্রীয় ভোজের আয়োজন করে-এটি একটি স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক রীতি। কিন্তু সার্বভৌমত্বের সর্বোচ্চ প্রতীক 'জাতীয় সংসদ ভবন'কে একটি নির্দিষ্ট বিদেশি রাষ্ট্রের উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা নজিরবিহীন।
সমালোচকদের মতে,এই ধরনের আয়োজন বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করে। সংসদ কোনো বাণিজ্যিক বা উৎসবের হলরুম নয়;এটি জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর পবিত্র স্থান। সেখানে অন্য দেশের পতাকা বা জাতীয় উৎসবের জাঁকজমকপূর্ণ প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে আমরা বিশ্বমঞ্চে কী বার্তা দিচ্ছি,তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।
বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতিতে 'আধিপত্যবাদ' শব্দটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। দেশের সচেতন মহল এবং সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরেই বাহ্যিক কোনো শক্তির অতি-হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সোচ্চার।
যদি এটি প্রতিবেশী ভারতের ক্ষেত্রে হতো: সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে,যদি এই একই ধরনের জমকালো উৎসব ভারতের কোনো জাতীয় দিবসকে কেন্দ্র করে সংসদ ভবনে আয়োজন করা হতো,তবে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে 'ভারতীয় আধিপত্যবাদ' ও 'গোলামি চুক্তি'র স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠত।
আমেরিকার ক্ষেত্রে নীরবতা বা অতি-উৎসাহ: অথচ আমেরিকার ক্ষেত্রে এই অতি-উৎসাহী অবস্থান একটি স্পষ্ট দ্বিমুখী নীতিকে নির্দেশ করে। কোনো বৃহৎ শক্তির সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার অর্থ এই নয় যে,নিজেদের আত্মমর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় প্রতীককে তাদের পদতলে বিলিয়ে দিতে হবে।
আমেরিকার সাথে পৃথিবীর বহু দেশের অত্যন্ত গভীর অর্থনৈতিক,সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। ইউরোপের পরাশক্তি থেকে শুরু করে এশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলোও আমেরিকার ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছে। কিন্তু পৃথিবীর অন্য কোনো আত্মমর্যাদাশীল দেশ—তা সে যত ছোট বা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বলই হোক না কেন-নিজেদের জাতীয় সংসদ ভবনকে মার্কিন স্বাধীনতা দিবসের ভেন্যু বানিয়েছে বলে কোনো নজির নেই। বাংলাদেশ কেন আজ প্রশ্নবিদ্ধ?
একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি -'সবার সাথে বন্ধুত্ব,কারো সাথে বৈরিতা নয়'। কিন্তু এই বন্ধুত্বের পরিমাপ করতে গিয়ে যদি নিজের ঘরের সম্মান বিলিয়ে দেওয়া হয় তবে তা আর কূটনীতি থাকে না;তা হয়ে দাঁড়ায় নতজানু মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
আমেরিকার মতো পরাশক্তির সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,তা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সেই সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য কূটনৈতিক প্রটোকল এবং দেশের সার্বভৌমত্বের সীমারেখাকে কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। জাতীয় সংসদ ভবনে এই ধরনের আয়োজন দেশের সচেতন নাগরিকদের মনে যে ক্ষোভ ও সম্মানের ঘাটতি তৈরি করেছে,তা ভবিষ্যতে এই জাতীয় স্পর্শকাতর বিষয়ে রাষ্ট্রকে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে বাধ্য করবে-এটাই প্রত্যাশা।
Comments